অনলাইন লিটলম্যাগ বলতে কী বোঝায়?


দুই হাজার ছয় সালে যখন প্রথম একটি সাহিত্যপত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করি, তখন নিজেদের কয়েকজনের লেখা প্রকাশ ব্যতীত কোনও উদ্দেশ্য-ভাবনা ছিলো না। আরেকটু পূর্বের কথা, আমরা কয়েকজন ক্লাসমেট যেহেতু কবিতা-গল্প লেখার চেষ্টা করছি, তো সেইটাকে প্রকাশ করলে কেমন হয়। কিন্তু চিন্তা হলো প্রকাশ করবো কোথা? ছোয়াদ নামে আমার এক বন্ধু ছিলো; সে বললো, ‘চল বই বের করি।’  আমরা বাকি চার-পাঁচজন ভাবলাম উত্তম প্রস্তাব। পরে মহাত্মা রাশেদুন্নবী সবুজের সাথে পরামর্শ করতে গেলাম। যেহেতু তিনি ওইসময় কুড়িগ্রাম জেলা ছাত্র ইউনিয়নের মুখপত্র ‘মঞ্চ’ প্রকাশ করতেন। তার সাথে পরামর্শ করার পরে খরচাপাতির কথা শুনে আমরা রণেভঙ্গ দিলাম। তার কিছু পরে ‘মঞ্চ’ আমার কবিতা প্রকাশ করলো, জীবনে প্রথমবার। সংখ্যাটি প্রকাশের প্রক্রিয়া খুব কাছে থেকে দেখলাম, পরের সংখ্যা প্রকাশও খুব কাছে থেকে দেখলাম। তখন মনে হলো এরকম করে আমিও তো একটা সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করতে পারি ক্ষুদ্রাকৃতির, মাত্র একটি এ-ফোর কাগজ এপিঠ ওপিঠ ফটোকপি করে ফোল্ডার। অবশ্য পরে ফোল্ডার করিনি। তবে রাশেদুন্নবী সবুজকে সেই মতো প্রস্তাব দিলাম। কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর তিনি উত্তর দিলেন, ‘লেখা যোগাড় কর। আর পত্রিকার নাম ঠিক কর।’ আজ আর অত মনে নাই কী কী নাম ভেবেছিলাম ঐ সময়; তবে শেষমেশ ‘বিন্দু’ নামটা ঠিক করলাম। আর কয়েকটি লেখাও যোগাড় করে ফেললাম। পুরোনো বন্ধু, যাদের সাথে বই প্রকাশের কথা ভেবেছিলাম প্রথমে তাদের লেখা নিলাম। দুই হাজার ছয় এর মার্চে প্রকাশিত হলো বিন্দুর প্রথম সংখ্যা। প্রথমদিকে কয়েকটি সংখ্যা ফটোকপি করে প্রকাশের পর আমরা প্রেসে ছাপতে শুরু করেছিলাম। এরপর দুই হাজার দশ সালের প্রারম্ভে বিন্দু কুড়িগ্রামের গন্ডি পেরুতে পারলো প্রথমবার। এরপর ক্রমাগত সার্বিক দিক থেকে পরিধি বৃদ্ধি হয়েছে।

দুই হাজার এগার সালের দিকে প্রথম ভাবলাম অনলাইনে লেখা প্রকাশের বিষয়ে। তখন ‘অনলাইন বিন্দু’, ‘ইবিন্দু’ এরকম নাম দিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিন্দুর ব্লগ চালু করেছিলাম। কিন্তু আমার সীমাবদ্ধতার জন্যই তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা যায়নি। দুই হাজার বারো সালে ‘দি টোকা’ নামে আরেকটি অনলাইন সাহিত্যপত্রিকা চালু করেছিলাম, যা পরবর্তীতে 'দিব্যক' নাম ধারণ করে প্রকাশিত হচ্ছে।

পরবর্তী সময়ে দুই হাজার চৌদ্দ-পনের সালের দিকে ‘চারবাক’ ও আরও কয়েকটি সাহিত্য পত্রিকা অনলাইনে প্রকাশ করার ব্যাপারে আমি তৎপর হয়ে উঠলে বাঙলাদেশের প্রাচীনপন্থী রক্ষণশীল লিটলম্যাগ গোষ্ঠী রৈ রৈ রব উঠায়, ‘জাত গেল জাত গেল...’। যেন ‘লিটলম্যাগের মতো একটা পবিত্র ব্যাপারকে সাম্য অনলাইনে নিয়ে গেল! যেখানে কত কত বাজারি জিনিস রয়েছে সেখানে কেন লিটলম্যাগ থাকবে? অনলাইন সংস্করণ থাকবে শুধুই বড় কাগজের, ছোট কাগজের না।’ কিন্তু আমার মাথায় অন্য ভাবনা। বলব সে কথা। কিন্তু সেই রক্ষণশীল গোষ্ঠীটিকেই দেখা গেল দুই হাজার সতেরোয় তারা নিজেই আর রক্ষণশীল থাকতে পারলো না, নিজেদের ওয়েবসাইট করে ফেললো। অবশ্য এক বছরও তা চালাতে পারেনি, টেনেটুনে কয়েক মাস। কিন্তু লক্ষ্য করতে হবে, কী এমন বিষয় অনলাইনে রয়েছে, যা তাদের মতো রক্ষণশীল গোষ্ঠীকেও টেনে নিয়ে আসে? এই শতাব্দীতে তাহলে অনলাইন ছাড়া উপায় নাই? না কি ফ্যাশন? প্রত্যেক জামানায় কিছু প্রযুক্তির বিশেষ উদ্ভাবন থাকে যা ঐ জামানায় ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে, জামানাকেই প্রভাবিত করে। যেমন বিদ্যুৎ, বৈদ্যুতিক বাতি ইত্যাদি আরো অনেক অনেক উদাহরণের কথা বলা যেতে পারে। তেমনই এই জামানায় এরকম জ্বলজ্বলে ঘটনাটি ইন্টারনেট। বাঙলাদেশের মতো একটি দেশ যেখানে দুই হাজার উনিশ সালেও পাঁচ হাজার টাকা ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে কৃষক আত্মহত্যা করে, দুইশ টাকা পারিশ্রমিক পাবার আশায় কোর্টে অপরাধীর প্রক্সি হিসেবে হাজির হয়, টাকার অভাবে মা তার সন্তানকে বিক্রি করে দেয় কিংবা পথে ফেলে যায় সেই দেশেও এশিয়ার সবচেয়ে চড়া দামে ইন্টারনেট কিনে ব্যবহার করে দশ কোটি লোক। ফেসবুকে একাউন্ট নাই এমন মানুষ খুঁজে পেতে কষ্ট হয়। এটির বদৌলতে এদেশের আঠার কোটি জনগণ আর দশ লাখ রোহিঙ্গা, প্রায় সবাই এখন সেলিব্রেটি। আধ মিনিটের জন্য হলেও সেলিব্রেটি হওয়া এখন সকলের নিয়তি খন্ডানোর উপায় নাই। যে মিডিয়া আপনি দেখতেন বাঙলাদেশের বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর কোলের কুত্তা, সেই মিডিয়ার আজ কোনো মূল্য নাই জনগণের কাছে। বরং এরা সরকার-কর্পোরেটের ভাঁড়ে পরিণত।

আগে আমরা দেখতাম সংবাদপত্রের (আসলে হবে বুর্জোয়া প্রচারপত্র) শুক্রবারের ফাও সাময়িকীর লোভে পত্রিকা কেনার প্রচলন ছিলো। আমি নিজেও কিনেছিলাম স্কুলে পড়ার সময়, কিন্তু এই সাহিত্যপাতা এখন কাউকে কিনতে-পড়তে দেখি না। যে পত্রিকা ছাপা হয় চৌদ্দ লাখ, তার সাহিত্যপাতাও ছাপা হয় চৌদ্দ লাখ। কিন্তু লক্ষ্য করবেন কয়েক বছর থেকে ওসব কাগজের লেখকেরা প্রকাশিত লেখাটির ছবি তুলে, স্ক্রিনশট নিয়ে, পিডিএফসহ নানাভাবে ফেসবুকে আপলোড করে, ইনবক্সে পাঠিয়ে লোকেদের পড়ানোর চেষ্টা করছে। এর কারণ, ওই লেখকরাও এটা জানেন যে ওসব সাহিত্যপাতা এখন আর কেউ পড়ে না। এখন ওখানে লেখে অভাবী লোক, যাদের যে কোনও মূল্যে টাকা/পাওয়ার/সামাজিক সম্মান দরকার। একই কথা কলামনিস্টদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। প্রতিদিন হাজার পত্রিকায় হাজার কলাম প্রকাশিত হয়, কিন্তু লোকে পড়ে না। কারণ লোকে জানে, লোকে শিক্ষিত; লোকে জীবন থেকে শিখেছে যে, ওসব নানাভাবে ক্ষমতাবানদের তৈলমর্দন ভিন্ন কিছু নয়। তাই লোকে পড়ে না। এখন কলামনিস্টরা তাই চৌদ্দ লাখ কপি  প্রকাশিত পত্রিকায় থাকা তার কলামটিরও ছবি তুলে ফেসবুক কিংবা ইনবক্সে দিতে বাধ্য হচ্ছেন আবার কখনো লিংক দিচ্ছেন। কেন এই কাজে ওই লেখক বাধ্য হচ্ছেন তা আমরা দেখতেই পাচ্ছি। উন্মুক্ত মিডিয়ার কাছে রক্ষণশীল-বুর্জোয়া মিডিয়ার মার খাবার দিন চলছে এখন। উপায় নাই গোলাম হোসেন।

এমন দিনে আমরা চাইছি সাহিত্যের প্রকৃত মিডিয়া গড়ে তুলতে। যে মিডিয়া আমাদের সাহিত্যের ক্ষতস্থান দিনের আলোর সামনে উন্মুক্ত করে দিবে, যে মিডিয়া আমাদের কাটা ঘায়ে চার রঙ সাথে লেমিনেশন করে পরিবেশন করবে না। সেই মিডিয়াকে আমরা ডাকছি ‘লিটলম্যাগ’ বলে। প্রচলিত ধারনামতে, ‘লিটলম্যাগ কাগজে প্রিন্ট করে প্রকাশিত হয়।’ যুগ যুগ ধরে এটাই হয়ে আসছে। কারণ যুগ যুগ ধরে কাগজ নামক বস্তুটির কোনও বিকল্প ছিল না। কিন্তু কাগজে প্রিন্ট না করে অন্য কোনও উপায়ে উত্তম প্রকাশ ঘটানো গেলে কেন তা হবার নয়? আমরা বিন্দু ওয়েবসাইট www.bindu.bangmoy.com করতে অনেক দেরি (২৬ মার্চ ২০১৯) করে ফেললাম। আরও আগেই করা দরকার ছিলো। দুই হাজার আঠারোর বইমেলায় যখন বিন্দুর স্টল ভেঙে দিলো বাংলা একাডেমি, তখন বিস্তারিত ঘটনা কোনও মিডিয়া জানায়নি। আমরা নিজেরা ফেসবুক স্ট্যাটাসে যতটুকু জানাতে পেরেছি ততটুকুই। আর কাগজে প্রিন্ট করে তা ঐ সময়ে বৃহত্তর পাঠক সমাজের কাছে পৌঁছে দেয়া আমাদের সাধ্যের বাইরে। তখনই প্রচন্ডভাবে অনুভব করলাম আবারও, বিন্দুর ওয়েবসাইটের কথা।

অনলাইনে লিটলম্যাগের কনসেপ্ট ধারন করে আমাদের আগে তিন-চারটি ওয়েবসাইট চালু হলেও সম্ভবত এক-দুইটি টিকে আছে। এর কারণ প্রথমত অনভ্যস্ততা, দ্বিতীয়ত রেগুলারিটি মেইনটেইন করতে না পারা। প্রিন্ট একটি সংখ্যা প্রকাশ করতে এক মাস শ্রম দিলেই যথেষ্ট, এমনকি এক সপ্তাহ শ্রম দিলেও তা সম্ভব। কিন্তু অনলাইনে তা সম্ভব নয়, তাকে নিয়মিত প্রকাশ-রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়। প্রকাশ ছাড়াও হ্যাক হওয়া ও আনুসঙ্গিক বিষয় সেখানে যুক্ত থাকায় এক-দুই সংখ্যা লিটলম্যাগ প্রকাশের মতো করে অনলাইন চালানো সম্ভব নয়।

বাঙলাদেশে যে অনলাইন সাহিত্য পত্রিকাগুলো প্রকাশিত হচ্ছে তাদের চরিত্রের দিকে নজর দেয়া যাক। পাঠক, এবারে আপনি চোখ বন্ধ করে তিন ধরনের সাহিত্য পত্রিকার চরিত্র মনে করার চেষ্টা করুন। প্রথমত সংবাদপত্রের সাময়িকী (সমকালের কালের খেয়া, প্রথম আলোর ‘সাহিত্য সাময়িকী’, কালের কণ্ঠর ‘শিলালিপি’, বণিক বার্তার ‘সিল্করুট’, সংবাদের ‘সাময়িকী’ ইত্যাদি), দ্বিতীয়ত লিটলম্যাগগুলো (জঙশন, গান্ডীব, শিরদাঁড়া, বিন্দু, সূর্যঘড়ি, প্রতিশিল্প, চারবাক, কামারশালা, বিরাঙ ইত্যাদি), তৃতীয়ত অনলাইন সাহিত্য পত্রিকাগুলো (কালি ও কলম, পরস্পর, শিরিষের ডালপালা, অলস দুপুর, চিন্তাসূত্র, বাছবিছার ইত্যাদি)। এই তিন ধরনের পত্রিকার মধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় ধরণ আগে থেকেই বাজারে হাজির ছিলো, তৃতীয় ধারাটি নতুন এসেছে। তৃতীয় ধারাটি অনেকটা কমন জেন্ডার ধরনের ব্যাপার; বড় কাগজের বৈশিষ্ট্য আছে আবার তার বাইরেও বৈশিষ্ট্য আছে। প্রচলিত যে অনলাইন সাহিত্য পত্রিকাগুলো আছে সেগুলোর চরিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এগুলোর লেখা সংগ্রহ ও প্রকাশের ধরন অনেকটা প্রথম ধরণটির মতো। কিন্তু প্রথম ধরণটির মতো অনলাইন সাহিত্য পত্রিকা বাজারে হাজির থাকলেও দ্বিতীয় ধরনটির মতো অনলাইন সাহিত্য পত্রিকা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা যারা লিটলম্যাগকর্মী, এইটিই আমাদের কাজের ক্ষেত্র। আমরা পত্রিকা তৈরি করি, বিলি করি, লেখাকে যথাযথরূপে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেবার ইচ্ছে থেকেই। তাহলে অনলাইনে যখন কাজটির ব্যাপ্তি ঘটাবার সময় এসেছে তখন আমাদের প্রতিক্রিয়াশীলের মতো বক্তব্য দিলে চলবে কী করে? কাগজে লিটলম্যাগ হতে পারলে তা অনলাইনেও হতে পারে। আমরা বিন্দুকে অনলাইন লিটলম্যাগ হিসেবেই গড়ে তুলতে চেষ্টা করছি। সম্প্রতি অনলাইনে এই ধরনের কাজ করছে charbak.com, walkingo9.blogspot.com, ও ulukharbd.com।

এখন যে মানুষটি এই তথ্যটিও জানে না যে, গুগল একটি সার্চ ইঞ্জিন সে-ও জানে যে, কিছু খুঁজতে হলে গুগলে সার্চ করতে হবে। গুগল ছাড়াও ডাকডাকগো এর মতো অনেক সার্চ ইঞ্জিন আছে, সেটাও হয়তো জানে না। কিন্তু খুঁজতে হলে আগে গুগলে লিখে ক্লিক করতে হবে এই তথ্য লোকেদের জানা। এমন অবস্থায় বাঙলাদেশে লক্ষ্য করবেন, ‘বাঙলা’ লিখে সার্চ করলে আগে ‘বাঙলা চটি’ চলে আসে, ‘বাঙলা কবিতা’ বা ‘বাঙলা সাহিত্য’ কিন্তু আসে না। ‘বাঙলা লিটলম্যাগ’ লিখে সার্চ করলে কিছু ‘ইছলামী পত্রিকা’ চলে আসে, ‘লিটলম্যাগ’ আসে না। এই অবস্থায় আমরা একদিকে বুর্জোয়া মিডিয়ার কাছে মার খাচ্ছি, অপরদিকে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর কাছে হেরে যাচ্ছি; পাঠক প্রতারিত হচ্ছেন। ‘লিটলম্যাগের কবি’ লিখে সার্চ করলে শামীম কবির বা নাভিল মানদার বা আরণ্যক টিটো বা আহমেদ মওদুদ আসে না, আসে তার নাম- যাকে বুর্জোয়া প্রতিষ্ঠান কবির মুখোশ পড়িয়ে রেখেছে। এই মুখোশ খুলে প্রতিষ্ঠানের এইসব নোংরা কারসাজি বন্ধে লিটলম্যাগকর্মীদেরই তো অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। তাছাড়া আর কে নিবে? প্রতিষ্ঠান কি  চাইবে যে লিটলম্যাগের প্রতিষ্ঠানবিরোধী কবিকে ‘কবি’ হিসেবে পাঠকের সামনে হাজির করতে? তাহলে এই দায়িত্ব কার? আমরা যেভাবে কাগজে প্রিন্ট করে পাঠকের সামনে প্রকৃত লেখক-শিল্পীকে হাজির করি, তেমনিভাবে অনলাইনেও এই কাজটি করতে হবে। লিটলম্যাগের লেখকদের বই, লেখা তুলে ধরতে হবে।

এবার আসি এই প্রসঙ্গে যে, লিটলম্যাগের অনলাইনে ওয়েবসাইট কিংবা ব্লগ খুলে করা যাবে কী না। এই প্রশ্নের উত্তর জানবার আগে এই প্রশ্নের উত্তর জানা দরকার যে, ‘লিটলম্যাগ কী?’ এ প্রসঙ্গে আমি কয়েকটি বক্তব্য আপনার সামনে হাজির করতে চাই।

“লিটল ম্যাগাজিন : বলেই বোঝা গেল যে জনপ্রিয়তার কলঙ্ক একে কখনো ছোঁবে না, নগদ মূল্যে বড়োবাজারে বিকোবে না, কিন্তু-হয়তো-কোনো-একদিন এর একটি পুরোনো সংখ্যার জন্য গুণিসমাজের উৎসুকতা জেগে উঠবে, সেটা সম্ভব হবে এইজন্যই যে, এটি কখনো মন জোগাতে চায়নি মন জাগাতে চেয়েছিল। চেয়েছিল নতুন সুরে নতুন কথা বলতে; কোনো এক সন্ধিক্ষণে যখন গতানুগতিকতা  থেকে অব্যাহতির পথ দেখা যাচ্ছে না, তখন সাহিত্যের ক্লান্ত শিরায় তরুণ রক্ত বইয়ে দিয়েছিল নিন্দা, নির্যাতন বা ধনক্ষয়ে প্রতিহত হয়নি। এই সাহস, নিষ্ঠা, গতির একমুখিতা, সময়ের সেবা না করে সময়কে সৃষ্টি করার চেষ্টা- এইটেই লিটল ম্যাগাজিনের কুলধর্ম।”
-বুদ্ধদেব বসু; লিটলম্যাগ ‘প্রগতি’ ও ‘কবিতা’ সম্পাদক

“আমার কাছে লিটল ম্যাগাজিনের মধ্যে কোনো লিটল ব্যাপার নেই, তা বাণিজ্যিক সাহিত্যের কোনো পরিপূরক নয়, প্যারালাল। লিটল ম্যাগাজিন হচ্ছে সাহিত্যের বিশিষ্ট একটি দৃষ্টিভঙ্গি, বেপরোয়া, রবীন্দ্র-পরবর্তী বাঙলা সাহিত্যে যা ক্রমশ প্রকট হচ্ছে, হয়ে উঠছে।  ... লিটল ম্যাগাজিনের মূলধন হচ্ছে সমস্ত রকম স্থিতাবস্থার বিরুদ্ধে তার বিপ্লবাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি ও সাহস। বড় কাগজ, সাহিত্যের বাণিজ্যসফল কাগজ, যা, যেসব ছাপতে ভয় পায় তাই ছাপবে লিটল ম্যাগাজিন যা কখনোই এই আর্থ-সামাজিক পরিবেশে বাণিজ্যিক নয়, বরং মৌলিক, একগুঁয়ে, যা পরীক্ষানির্ভর। কখনো কখনো উস্কানিমূলকও। খ্যাতিমানের অনুগ্রহে এক-আধ পৃষ্ঠায় এঁটোর তোয়াক্কা সে করে না। পুরনো কালের সৃষ্টিশীল বিষয়গুলো পুনরাবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে সমসাময়িককালে নতুন কে কি লিখছে তার একটা ধারণা তুলে ধরার দায়িত্ব লিটল ম্যাগাজিনের। প্রচলিত ধ্যান-ধারনাগুলোর ফাঁপা জায়গাটা সে দেখিয়ে দেবে, সমস্ত রকম ভাঙচুর আর পরীক্ষা-নিরীক্ষার পৃষ্ঠপোষকতা করার দায়িত্ব তার, সাহিত্যের সবরকম আর সব দিকের সম্ভাবনাগুলো খতিয়ে দেখার - আর সেই সূত্রেই একধরনের বেপরোয়া আর বেহিসাবি তার ভঙ্গি। আগামী প্রজন্মের সমস্তরকম প্রশ্ন-চিহ্নের প্রতি তার থাকবে পিতৃ-প্রতিম সহানুভূতি। লিটল ম্যাগাজিন যেহেতু মূলত সাহিত্য-সংস্কৃতি নির্ভর, তাই এ বিষয়ে নানারকম মত থাকবে, থাকতে পারে, সে-সবকেই তুলে ধরবে লিটল ম্যাগাজিন- কেননা তাইই প্রবাহিত মনুষ্যত্ব, তাই জীবনের লক্ষণ।”
- সুবিমল মিশ্র; প্রতিষ্ঠানবিরোধী কথাসাহিত্যিক

লিটল ম্যাগাজিন বলতে বুঝি যেটা সাহিত্যের নতুন পালাবদলকে ধারণ করে। যে কাগজের ভেতর দিয়ে সাহিত্য নতুন পথের দিকে পা দেয়- এটাকে বলে লিটল ম্যাগাজিন।
- আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ; লিটলম্যাগ ‘কণ্ঠস্বর’ সম্পাদক; বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠাতা

“ছোট্ট দুটি ডানায় অনন্ত আকাশকে ধরার স্পর্ধা- তার নাম লিটল ম্যাগাজিন।”
-খোন্দকার আশরাফ হোসেন; সাহিত্যপত্রিকা ‘একবিংশ’ সম্পাদক

“প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধ, রাজনৈতিক আর্দশ কিংবা দার্শনিক প্রত্যয়কে আঘাত করার মধ্যেই ছোটকাগজের বৈশিষ্ট্য নিহিত থাকে। কারণ আমরা জানি এক সময়কার বৈপ্লবিক চেতনা  ও তাত্ত্বিকতা জাগতিক ও সামাজিক অগ্রগতির নিয়মেই Radicalism-এ পরিণত হয়। তা সবকিছুকে নিজস্ব ছাঁচে ফেলে বিচার করতে চায়। তাবৎ সমাজ-সংস্কৃতির ত্রাণকর্তা সেজে বসে সে। লিটল ম্যাগাজিন (সত্যিকার অর্থে) এ অর্বাচীনতার তফাৎ দেখিয়ে দেয় আমাদের। দ্ব্যর্থকভাবেই, জ্ঞানতত্ত্বেও এ পর্যায়ে লিটল ম্যাগাজিনগুলো সমাজেরও চিন্তার রুদ্ধ স্রোতকে ভেঙে দেয় অনায়াসেই। মূলতঃ বেঁচে থাকার সক্রিয় চেতনাই একটি লিটলম্যাগকে দেয় হয়ে ওঠার মেজাজ। ... একটি লিটল ম্যাগাজিন শুধুমাত্র সাম্প্রতিককালের চেহারাকেই ধারণ করে না, উপরন্তু ভবিষ্যতের সীমানাও চিহ্নিত করে। একটি সৎ ছোট কাগজ আমাদের বলে দেয় বিপ্লবের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় নি। আসলে রাষ্ট্র ও সমাজ নামক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজের মধ্যেই বিরোধিতার বীজ সুপ্ত থাকে। ছোট কাগজগুলো তার অস্তিত্বকে প্রতিষ্ঠিত করে। প্রতিষ্ঠান ও প্রথাবিরুদ্ধতার ক্ষেত্র হিসেবে নতুন ভাবুকদের জন্য এটি মুক্তির মোর্চা গড়ে তোলে। সুতরাং কখনো নিয়ন্ত্রিত হবে না এরকম বোধ ও ভাবনাই ছোট কাগজের চরিত্র বৈশিষ্ট্য।”
-এজাজ ইউসুফী; লিটলম্যাগ ‘লিরিক’ সম্পাদক

পাঠক, উপরের কোনও একটি বক্তব্য থেকেও কি এমনটা মনে হচ্ছে যে, কাগজে ছাপানোর বিষয়টি লিটলম্যাগের জন্য বাধ্যতামূলক শর্ত? শুধুমাত্র মন্দবুদ্ধির লোক ব্যতিত এমত উদ্ভট দাবি কোনও লিটলম্যাগকর্মীর পক্ষে করা সম্ভব নয়। বরং আমরা আমাদের চিন্তাকে আমাদের স্বাধীন মতো প্রচার করার পদ্ধতি গ্রহণের মধ্য দিয়ে আমাদের প্রতিবাদ, আমাদের সাহিত্য পাঠকের কাছে পৌঁছে দেবার জন্য আরও কার্যকরী-উন্নত পদ্ধতি ব্যবহারের বিষয়ে চিন্তা করবো। সময়ের প্রেক্ষিতে এমনটাই আমাদের করতে হবে। মূল কথা হচ্ছে ‘বৈশিষ্ট্য’। লিটলম্যাগের যে ‘বৈশিষ্ট্য’ উপরে উল্লেখ করলাম, সেই বৈশিষ্ট্য যদি ঠিক থাকে তাহলে সেটি লিটলম্যাগ। লক্ষ্য করলে দেখবেন যে ‘কাগজে ছাপানো’ ঘটনাটির অনেক বিকল্প গড়ে উঠছে ধীরে ধীরে। এখন অনেকেই কাগজের বই না পড়ে পিডিএফ পড়ে, অডিওবুক শোনে, পডকাস্ট শোনে। অনলাইনে বইয়ের বিকল্প অনেক রকম পদ্ধতি আছে।

তাই নিজের লেখা, নিজেদের লেখা, চিন্তা, আর্ট ছড়িয়ে দেবার জন্য এই সকল মাধ্যমকে যথাযথ ব্যবহার করতে হবে। লিটলম্যাগ মুভমেন্ট হবে এখন সবদিক থেকে। শুধু প্রিন্ট পদ্ধতিতে আটকে থাকলে হবে না। কাগজে যেমন সাহিত্য পত্রিকার সাথে লিটলম্যাগের ভেদ রয়েছে, তেমনই অনলাইনেও সাহিত্য পত্রিকার সাথে লিটলম্যাগের ভেদ আছে। আমাদের কর্তব্য লিটলম্যাগের সাহিত্যকে অনলাইনে দৃশ্যমান করে তোলা।

আর এই ক্ষেত্রে বলা হয়ে থাকে, ‘ওয়েবসাইট ব্যবহারে লোকে অভ্যস্ত না।’ দেখবেন, লোকে অনলাইনে বই পড়তে অভ্যস্ত না কিন্তু পর্ণ দেখতে অভ্যস্ত। যার যেদিকে আগ্রহ সে সেদিকে ঠিকই উপায় করে নেবে। বিচলিত হবার কিছু নাই।

তবে দুশ্চিন্তার বিষয় এটা যে, আমরা যারা লিটলম্যাগ করি, আমাদের শুধু অনলাইন সংস্করণ (একটা ওয়েবসাইট বা ব্লগ) প্রকাশ করা কিছুতেই চলবে না; বরং অনলাইন ও প্রিন্ট দুটোই চালাতে হবে। কেননা অনলাইন সংস্করণের সব থেকে খারাপ দিক হলো এটি হ্যাক করে বন্ধ করে দেয়া যায়; অথবা সরকার যদি চায়, মুহূর্তেই বিনা নোটিশে মাত্র এক ক্লিকেই সাইট বন্ধ করে দিতে পারে। এই দেশে এমন ঘটনা নিউজ ওয়েবসাইটের ক্ষেত্রে হয়েছেও। কিন্তু প্রিন্ট কপি এদিক থেকে অনেকখানি সুবিধা দেয়। বাজেয়াপ্ত হতে পারে বটে, কিন্তু তা কার্যকর হবার ফাঁকেই কিছু না কিছু কপি পাঠকের হাতে পৌঁছে যায়ই। তখন তা পুরোপুরি আটকানো কি আর সম্ভব? তবে ইন্টারনেটে কনটেন্ট ছড়িয়ে দিতে পারলেও তা হাইড করা বিপরীত পক্ষের জন্য অসম্ভব হয়ে ওঠে। তবে এই পর্যায়ের দক্ষতা গড়ে উঠতে সময় লাগবে আরও। আপাতত কয়েকটি লিটলম্যাগ মিলে একটি ওয়েবসাইট বানানোর কথা ভেবে দেখা যেতে পারে। যেখানে সংখ্যাগুলোর পিডিএফ আপলোড করা হবে। তাতে করে প্রতিটি লিটলম্যাগের স্বাতন্ত্র্যও বজায় থাকবে আবার অনলাইনে দৃশ্যমানও হবে। আমি জানি সেই দিন আসবেই; কাগজে বুর্জোয়া পত্রিকার মোড়লগিড়ি/দম্ভ যেমন চূর্ণ হয়েছে লিটলম্যাগের কারণে, তেমনই অনলাইনেও বুর্জোয়া প্রতিষ্ঠান আর তার তাবেদারদের দম্ভ চূর্ণ হবে অনলাইন লিটলম্যাগের কারণে।

0 comments: