দুই বাঙলার নাট্যোৎসবে দেখা ছয়টি নাটক


ঢাকার বাইরে থাকলে নিয়মিত মঞ্চনাটক দেখার সুযোগ হয় না। বিশেষত তা যদি কুড়িগ্রাম ধরনের জেলা হয়, তাহলে তো কথাই নেই। শোনা যায়, মঞ্চের জন্য যে শ্রম দিতে হয় তার মানসিকতার অভাব। লোকে এখন অল্পেই সেলিব্রেটি হতে চায়। শর্টকাট পথ খোঁজে। দেশের আঠার কোটি জনগণ আর দশ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা, সকলেই এখন ফেসবুক সেলিব্রেটি। আধ মিনিটের জন্য সেলিব্রেটি হওয়া এখন প্রত্যেকের নিয়তি। এমন এক অস্থির সময়ে, শিল্পের কণ্টকাকীর্ণ পথে হাঁটার মানসিকতা কয়জনের থাকে?

একটা নাটক মঞ্চে প্রদর্শনের জন্য প্রস্তুত করাটাও দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার। মাসের পর মাস সময় লাগে। তারপর হয় প্রদর্শনী। সর্বোচ্চ এক ঘন্টা হয়তো সেই নাটক নিয়ে মঞ্চে থাকা যায়। কিন্তু সেই তুলনায় নাচ-গান করলে মঞ্চে ফোকাস হবার সুযোগ-সম্ভাবনা অনেক বেশি। একটা গান কোনোরকম গাইতে পারলেই মঞ্চে ওঠা নিশ্চিত। এইসকল কারণে মফস্বলের নাট্যদলগুলো কর্মীসংকটে ভোগে। আর এখন তো সংগঠনের অভাব নেই। সব সেলিব্রেটি ধরণের সংগঠন। ওসবে বেশ একটা অরাজনৈতিক স্বেচ্ছাসেবী স্বেচ্ছাসেবী ভাব থাকে। তাতে বোধয় সেলিব্রেটি হওয়া আর মাল কামানো দুটোই করা যায় নীরবে। ধরুন ‘কম্বল দেয়া’ ধরনের কাজে পরিশ্রমও অল্প; আবার পয়সা খরচ কম করেও ঠিকঠাক ছবি তুলে পত্রিকায় দিতে পারলেই সেলিব্রেটি হওয়া আটকাচ্ছে কে? 

কুড়িগ্রাম শহরে গত বেশ কিছু বছর ধরে জনগণকে নাটক দেখার ব্যবস্থা প্রচ্ছদই করে দিচ্ছে। কুড়িগ্রাম শহরে অঙুলিমেয় সক্রিয় সাংস্কৃতিক সংগঠন যে কয়েকটি আছে তারা মাঝে মধ্যে, দিবসকেন্দ্রিক গানবাজনার মধ্যেই নিজেদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ করে ফেলেছে। এখানকার সবচেয়ে সক্রিয় সাংস্কৃতিক সংগঠনটি ‘প্রচ্ছদ’, অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কাজ করে চলেছে। সাধ-সাধ্য-প্রত্যাশা সমতালে চলে না।

গত ২৭ মার্চ ২০১৯ থেকে ৩১ মার্চ ২০১৯ পর্যন্ত তারা কুড়িগ্রাম টাউন হলে ‘পাঁচ দিন ব্যাপী দুই বাঙলার নাট্যোৎসব ২০১৯’ আয়োজন করেছে। তাদের জন্যই রংপুর, কুড়িগ্রাম, ঢাকা ও ভারতের কলকাতা, শিলিগুড়ির নাট্যদলের নাটক দেখার সুযোগ হলো। প্রতিটি নাটক দেখেছি আর নোট করেছি কোন নাটক কেমন লাগলো।

প্রথম দিন দেখলাম রংপুর নাট্যকেন্দ্রের পরিবেশনা ‘কানাই চাঁদের নন্দিনী’। বাঙলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ মৈমনসিংহ গীতিকা- যা বাঙলা লোক সাহিত্যকে স্বমহিমায় আলোকিত করেছে। মৈমনসিংহ গীতিকার অন্যতম শ্রেষ্ঠ পালা ‘মহুয়া’য় যে চিরায়ত প্রেম বর্ণিত হয়েছে, তা শুধু বাঙলার গ্রামীন নর-নারীর মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং দেশ কালের সীমা অতিক্রম করে ধ্রুপদী প্রেমের কালজয়ী আখ্যানে রূপ লাভ করেছে। মূল সাহিত্যে দ্বিজ কানাই এর মহুয়া পালার বিভিন্ন ব্যবহারিক দিক উপস্থাপনার পাশাপাশি নাটকের মূল বিষয়টিকে আধুনিক চিত্তের আলোকে বৈশ্বিক সম্পর্কে উন্নীত করে প্রেমের চিহ্ন অংকনের চেষ্টা করেছেন নির্দেশক লিটু সরকার। তুলনামূলক দীর্ঘ এ নাটকটির নাট্যরূপও তিনিই দিয়েছেন। পুরো নাটক টানতে টানতে বিরক্তিকর পর্যায়ে চলে গেছে। অভিনয়ের কোনো ঠিক ছিলো না; অতিরিক্ত অভিনয়ের চেষ্টা নাটকটির উপস্থাপন দুর্বল করে ফেলেছে।

দ্বিতীয় দিন ছিলো আয়োজক দল অর্থাৎ প্রচ্ছদের নাটক ‘নামানুষ’। হাবিব জাকারিয়া উল্লাস রচিত নাটকটির নির্দেশনা দিয়েছেন বিপ্লব সরকার। প্রথমেই বলে রাখি, উৎসবের সবচেয়ে ব্যতিক্রম নাটক ছিলো এটি। মানবজীবনের বিষয়-আশয় অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে এখানে। কাহিনী সংক্ষেপ: মহাজগত রহস্যময়। সভ্যতার বয়স ক্রমশ প্রাচীন হতে থাকলেও বহু প্রশ্নের উত্তর মানুষের অজানা। মূল প্রশ্ন পৃথিবীতে তার জন্ম, জন্মের উদ্দেশ্য এবং মৃত্যু নিয়ে। এ বিষয়ে মানুষ ভেবেছে এবং জন্ম দিয়েছে নানা ধর্ম, দর্শন, সংগঠন, কৃত্য এবং আচার। এই ভাবনাগুলো বিভিন্ন রকমের, অনেক ভাবনার মৃত্যু ঘটেছে এবং জন্ম নিয়েছে নতুন ভাবনা। কেউ ভাবনার আবিষ্কারক, কেউ ভাবনার অনুসারী। এই অনুসরণ অনেকের জন্য তৃপ্তির, স্বস্তির। কিন্তু কারও কারও জন্য তা নয়। যারা বিশ্বাস করে প্রতিটি মানুষ আলাদা অস্তিত্ব, প্রতিটি অস্তিত্ব সব যৌথতার পরেও নিজের মত করে সফল ও বিকশিত হতে চায়। ঠিক সেখানে যখন তার দৃষ্টি যায় তখন সে নিজের অস্তিত্ব আবিষ্কার করতে চায় মহাজগতের সকল রহস্যের মাঝে, সকল আবিষ্কার ও অনাবিষ্কারের মাঝে। সে বিচার করে দেখতে চায় ‘মানুষ’ বলে যে রূপ-কাঠামো তার সামনে উপস্থিত হয়েছে, তাই চূড়ান্ত কী না? এই কঠিনকে ভালবেসে পাওয়া যাবে কি আত্মসন্ধান? সে পরের কথা, কিন্তু তার আত্মসন্ধানের অভিযাত্রা শুরু হয় ‘না’ বলার ভেতর দিয়ে। না বলবার সাথে সাথে তার দৃষ্টি উন্মোচিত হয় এবং সে দৃষ্টি ক্রমাগত যা দেখতে শুরু করে তারই এক রকমের অভিজ্ঞতার বয়ান এই ‘নামানুষ’।

প্রথমেই বলে রাখি ‘নামানুষ’ নাটকটির এটিই প্রথম মঞ্চায়ন। আমি স্ক্রিপ্টের তিনটি পৃষ্ঠা একদা হাতে পেয়েছিলাম, দ্রুতই পড়ে নিয়েছিলাম ওটুকু। পড়ার পর থেকে এর ব্যাপারে আমি আগ্রহী হয়ে উঠি পুরোটা পড়ার জন্য। এটি মঞ্চায়নের কিছুদিন পরে নির্দেশক আমার আগ্রহ মিটিয়েছিলেন। বলাই বাহুল্য, বেশ ভাল লেগেছিলো পড়ে। এটির মঞ্চায়ন দেখার সুযোগ হলো প্রচ্ছদের কল্যানে। তারা এ ধরনের একটি নাটক মঞ্চায়নের জন্য ধন্যবাদ পাওয়ার দাবি রাখে। মঞ্চায়ন শেষে পরিচিতি পর্বে আমি জানতে পারি যে, যারা এ নাটকে অভিনয় করেছেন তার মধ্যে মাত্র পাঁচজন ব্যাতিত বাকি সকলে জীবনে প্রথমবার মঞ্চে উঠেছেন। আরও অবাক হবার মতো ব্যাপার এই যে, এই নতুন কুশীলবগণ মঞ্চনাটক দ্যাখেননি পর্যন্ত!

মঞ্চে আলোর ব্যবহার ছিলো ত্রুটিপূর্ণ। ঠিক জায়গায় ঠিক আলোর কখনো কখনো ঘাটতি চোখে পড়েছে। সংগীতের ব্যবহার ভাল ছিলো না মোটেই, প্রধানত যেটা আড়াল থেকে আসছিলো। এছাড়া অভিনেতা নিজেই অভিনয় করছে আবার গানও গাইছে ব্যাপারটা কঠিন বটে। টি-শার্টের সাথে জিন্স এই পোশাকের সার্বজনীন ব্যবহার করে চরিত্র ফুটিয়ে তোলার চেষ্টাও আমার কাছে কঠিন মনে হয়েছে। সফোক্লিসের পোশাক  ‘গাউন’ ধরনের কিছু হলে বোধয় আরও ভাল হতো।

মঞ্চে পরিবেশনের উপযুক্ত করে স্ক্রিপ্টটি গোছানো ছিল না। ডিটেইলিং এর অভাব ছিল অনেকগুলো জায়গায়। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে হেলেন চরিত্রটি। যা ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে এসেছে। এটি এই নাটকে আবির্ভাবের কিছুটা ব্যাকগ্রাউ- থাকলে ভাল হতো। এরকম আরও আছে। অনেকক্ষেত্রেই মনে হচ্ছিল, দৃশ্যের কোনো লিংক নেই। পুরো নাটক জুড়ে একটাই লিংকআপ রয়েছে তা হলো দর্শনগত। 

সব নাটক সবার জন্য না। যেমন সাহিত্যের সকল কিছু সবার জন্য না। যার যার ধারণ ক্ষমতা, সামর্থ্য অনুয়ায়ী সাহিত্যের রস আস্বাদন করতে পারবেন। আমি মনে করি, এই নাটক দেখিয়ে প্রচ্ছদ কুড়িগ্রামের দর্শকদের উপকারই করেছে। আর যা কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি তা ক্রমাগত রিহার্সেল আর পরবর্তী মঞ্চায়নে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। কিন্তু এই সব ত্রুটি নিয়েও, প্রচ্ছদের নাটক ভাল লেগেছে।

আয়োজনের তৃতীয় দিন দেখলাম কলকাতা থেকে আগত ‘মিউনাস’ (মিতালী-উৎসব নাট্য সংস্থা) এর নাটক ‘দূষণ’। এটির রচয়িতা ও নির্দেশক উৎসব দাস। এটি একটি খুনের গল্প, সন্ত্রাসের গল্প, প্রতিবাদের গল্প। এক লোক খুন হয়। সোনা নামের একটি কিশোরী চরিত্র সেই ঘটনা দেখে ফেলে। পরবর্তীতে সেই চরিত্রটি মানসিক অস্থিরতায় ভুগতে শুরু করে। ডাক্তার আসে। চিকিৎসা চলে। এর মধ্যে লোক জানাজানি হয়। দেখা যায়, ঘটনার একমাত্র সাক্ষী সোনা। পুলিশ সোনার বাড়িতে আসে। তার বাবা মাকে জেরার পর জেরা করে হেনস্তা করে এবং শেষে দফারফা করার জন্য টাকা দাবি করে। এরপর এলাকার কাউন্সিলর আসে। সে পরামর্শ দেয় টাকা দিয়ে পুলিশের সাথে দফারফা করার। এভাবেই নাটক চলতে থাকে। শেষে বক্তব্য দেয়া হয়, এভাবে আর কতদিন চলবে? প্রতিবাদ করতে হবে। 

এইটা একটা সামাজিক সচেতনামূলক নাটক। ধরুন, এই দেশে টিআইবি বা আরডিআরএস বা জীবিকা ইত্যাদি এনজিও যেসব নাটক গ্রামগঞ্জে পরিবেশন করে জনগণকে সচেতন করার জন্য, এটি সেই ধরনের একটি নাটক। যান্ত্রিক সংগীতের বিকট আওয়াজ আর আলোর ব্যবহার নাটকটির জ্বলজ্বলে ব্যাপার। বিশেষত টেলিফোন বেজে ওঠার দৃশ্যে রিংটোনটি যতোটা উচ্চরবে বাজানো হয়েছিলো সে কথা মনে হলে এখনো ডিস্টার্ব বোধ করি। অবশ্য এটি আমার শব্দভীতির কারনেও হতে পারে। সেট ডিজাইন ও আনুষঙ্গিক বিষয় দেখে আমি অত্যন্ত দুঃখের সাথে ভাবছিলাম, এঁরা স্টার জলসা বা জি বাংলা ঘরানার সিরিয়ালের বাইরে বেরিয়ে আসতে পারেনি মঞ্চেও। পুরোটা সময় একবারও মনে হয়নি, মঞ্চনাটক দেখছি। বরং মনে হচ্ছিলো টিভি সেটের সামনে বসে ই-িয়ান সিরিয়াল দেখছি। অভিনয়ও ও-ই, সিরিয়ালের মতোই। কৃত্তিম সংগীত আর সেট বাদ দিলে ওটিতে আর কিছুই থাকে না। দে হ্যাভ নো ড্রামা। কয়েক বছর আগে যে কাজ দেখেছিলাম তাদের, সেখান থেকে কোনোরকম মানোন্নয়ন ঘটে নাই, ইহা দুঃখজনক। অথচ তাঁদের ওখানে তেপান্তর থিয়েটার, রতন থৈয়াম, গৌতম হালদার, প্রবীর গুহ এরকম আরও অনেক অনেক নাম বলা যাবে যাঁরা কী দারুণ কাজ করে চলেছেন মঞ্চনাটকে। ক্লাসিকের সাথে নানা রকম এক্সপেরিমেন্ট তো আছেই। বাঙলাদেশে জামিল আহমেদ, আশীষ খন্দকার প্রমূখ ব্যক্তিবর্গের কাজ যদি এনারা মনোযোগ দিয়ে দেখতেন তাহলেও হয়তো চিন্তাজগতে পরিবর্তন ঘটতো। আমি জানি না এঁরা সারাজীবন এসবই করে না কি বাঙলাদেশে আসার সময় এ ধরনের সিরিয়ালমার্কা নাটক নিয়ে আসে।

উৎসবের চতুর্থ দিন ছিলো বিশেষ আকর্ষণ সৈয়দ শামসুল হকের নাটক ‘চম্পাবতী’। ঢাকার ‘শব্দ নাট্যচর্চা কেন্দ্র’ পরিবেশিত এ নাটিকটির নির্দেশনা দিয়েছেন খোরশেদুল আলম। সাপের খেলা দেখানো বেদে দলকে ঘিরে এই নাটক। গয়া বাইদ্যার সুন্দরী রূপবতী স্ত্রীর নাম চম্পাবতী। নানা ঘাটে ঘুরতে ঘুরতে একসময় তারা নৌকা ভেড়ায় পদ্মার পাড়ে। এখানেই খেলা দেখানোর এক পর্যায়ে চম্পাবতীকে দ্যাখে গ্রামের মোড়ল। এবং চম্পাবতীর রূপে আকৃষ্ট হয়ে হরণ করতে চায়। বেদে দলকে সে বলে চম্পাবতীকে রেখে যেতে। গয়া বাইদ্যা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে মোড়লের কথায়। বাধে সংঘর্ষ। মোড়ল তাদের উচ্ছেদ করে। চম্পাবতী সকলের জীবন রক্ষার্থে মোড়লের প্রস্তাবে রাজি হয়। বেদে সম্প্রদায় তাকে রেখেই চলে যায়। গয়া বাইদ্যা দলের আরেক নারী আসমানীর সাথে ঘর বাঁধে। বৈষ্ণবীর মাধ্যমে চম্পাবতী বেদে পরিবারের সকল খবর রাখতো। মোড়লের বাড়িতে অতি কষ্টে অবস্থান করলেও সে মোড়লের কু-প্রস্তাবে রাজি হয়নি কখনো। ফলে মোড়ল তার চুল কেটে দেয় এবং প্রহার করে। মোড়লের স্ত্রী এসব (নারী নির্যাতন ও সতীন তৈরি হবার আতঙ্ক) সহ্য করতে না পেরে চম্পাবতীকে পালাতে সাহায্য করে। চম্পাবতী বেদে বহরে ছুটে গিয়ে দ্যাখে গয়া বাইদ্যাকে সাপে কেটেছে। গয়া বাইদ্যার নতুন স্ত্রী আসমানী শত চেষ্টা করেও বিষ নামাতে পারছে না। চম্পাবতী গয়ার শরীরের বিষ মুখ দিয়ে তুলে নিয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে। বিষে নীল হয়ে যায় চম্পাবতী।

মঞ্চসজ্জা ভাল ছিল। আর সব থেকে ভাল লেগেছে লাইভ গানগুলো। যা আড়াল থেকে গাওয়া হচ্ছিলো। এটি দেখে মনে হয়েছে একটি মঞ্চনাটক দেখলাম। সৈয়দ হকের গল্পেই আসলে এটি পার পেয়ে গেছে। স্ক্রিপ্টের কারণে উৎরে যাওয়া নাটক। আলোর ব্যবহার ছিলো সুন্দর। শুধু একটা জায়গায় খটকা লেগেছে, সিঁদুর দেয়া বেদেনী বিপদে পড়ে আল্লাকে ডাকলো কেন! 

আমি যখন নাট্যেৎসবের প্রচারণায় শিলিগুড়ির নাট্যদলটির নাম দেখেছিলাম ‘সৃজনসেনা’, প্রথমে একটু ভয়ই পেয়েছিলাম। ওদিকে শিবসেনার জয়জয়কার কী না, তাই। হা হা হা। শেষ দিন ছিলো সেই সৃজনসেনার দুইটি নাটক। প্রথমটি ‘একুশে অঞ্জলি’ আর দ্বিতীয়টি ‘ম্যানিকুইন’। দুইটি নাটকের রচয়িতা ও নির্দেশক পার্থপ্রতিম মিত্র।

একুশে ফেব্রুয়ারিকে কেন্দ্র করে ‘একুশে অঞ্জলি’ নাটকের বিস্তৃতি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ভারতে চলে যাওয়া দুইজন মানুষ, যারা বার্ধক্যের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছেন, তাদের কেন্দ্র করেই এ নাটক। তারা একসময় প্রেমে ছিল- লড়াইয়ে ছিল- একুশে ফেব্রুয়ারির মিছিলে ছিলো- উদ্বাস্তু শিবিরে ছিলো। সজীব স্মৃতি-কঠোর বাস্তব-সংসারের আটপৌড়ে যাপন মিলেমিশে একুশে ফেব্রুয়ারিতে কেমন আছেন তারা? কী করেন তারা? এখন এখানেও কি লড়াই করতে হচ্ছে সেই ভাষারই জন্য? বৃদ্ধ, বৃদ্ধা এবং তাদের পুত্রবধূ, এই তিন সদস্যের একটি পরিবারের ভেতরে সেই লড়াই ফুটে উঠেছে।

এটিকে পথনাটক বলাই বোধহয় উচিত। অত্যন্ত স্বল্পাকৃতির এ নাটকে পুরনো বহুব্যবহারে জীর্ণ ডায়ালগ ব্যতীত বিশেষ কিছু কাজ ছিলো না। স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী প্রয়োজনও হয়তো ছিল না বিশেষ কোনও মঞ্চসজ্জা বা আলোর ব্যবহার ইত্যাদির। মঞ্চে একটি ঘরের আবহ ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। 

এটির পরেই শুরু হয় নাটক ‘ম্যানিকুইন’। গল্পটি এরকম, ‘মা কালী বস্ত্রালয়’ নামে একটি দোকান ছিল, যেটি বিশ্বায়নের বাতাশে হয়ে ওঠে ‘মাইকেল শপিং মল’ আর বস্ত্রালয়ের মালিক সজনী দত্ত হয়ে গেল সজনে ডাটা। ঝলমলে সেই শপিং মলে প্রদর্শিত হয় চোখ ধাঁধানো মানব ম্যানিকুইন। গ্রাম থেকে আসা এক গরীব শিল্পী, যে আগে গ্রামের মেলায় ‘চ্যাপলিনের খেলা’ দেখাতো, পেট চালাতে এখানে চার্লি চ্যাপলিন সেজে দাঁড়িয়ে থাকে সকাল থেকে রাত অবধি। তাকে কেন্দ্র করে শুরু হয় ঘটনা প্রবাহ। অনেক অভাব-অনটনের মধ্যে যে চ্যাপলিন সংগ্রাম করেছে বেঁচে থাকার জন্য, সেই চ্যাপলিনকে মালিক ‘চোর’ বলে অপবাদ দেয়াটা সে কোনোভাবেই মানতে পারে না। এটাই শিল্পীর আত্মসম্মানবোধ। স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে যায়, কিন্তু প্রকাশ্যে মনে হয়, সে কারণেও তার কোনও দুঃখ নেই! কিন্তু চোর বলে অপমান করাটা কিছুতেই সহ্য করতে পারে না। ধনতন্ত্রের নর্তন-কুর্দন আস্ফালনে ম্যানিকুইন চ্যাপলিন পিষ্ট হয়। রিক্ত হয়। একসময় বেছে নেয় আত্মহননের পথ।

দারুণ এই গল্পটি দেখে খুব ভাল লেগেছে। দর্শনগত জায়গায় গল্পটিকে ইউনিক বলা না গেলেও, এই রকম একটি নাটক নিয়ে আসার জন্য সৃজনসেনা ধন্যবাদ পাবার যোগ্য। চ্যাপলিনের অভিনয় খুবই ভাল লেগেছে। মঞ্চসজ্জা ছিল যথার্থ। মালিকের চরিত্রে যিনি অভিনয় করেছেন তিনিও ভালই দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। কিছু ডায়ালগ মস্তিষ্কে স্থায়ী রয়ে যায়। মূল সাবজেক্টের বাইরে মঞ্চে অবজেক্টের আসা-যাওয়া নাটকটিকে আরও বেশি প্রস্ফুটিত করেছে। অবজেক্ট ক্যারেক্টার নাটকটিতে শুধু শপিং মলের আবহই ফুটিয়ে তোলেনি, পাশাপাশি সমাজে বিরাজমান আরও কিছু চরিত্রকে সামনে নিয়ে এসেছে।


0 comments: