অনিকেত শামীমঃ ৩৬০ কিলোমিটার দূর থেকে অসংলগ্ন কথামালা

ওড়ে ধূলিকণা। অপার রহস্য আজ আমাদের মাঝে
দূরে আরও দূরে গ্রামের পিছনে যেখানে আকাশ নামে
সেখানে তোমার নিবাস। আমার নামধাম না-জানাই ভাল
এই তো আছি কাছাকাছি অথবা আলোকবর্ষ দূরে
...
...
আমি সহজপাঠ্য। কোনো ঝুট-ঝামেলা নেই
এসো- আমরা সরল অংক কষি।

(দূরত্ব)

কিছুদিন আগে হাতে এসেছে একটি বই; ‘অনিকেত শামীমের কবিতা’। তা থেকেই উদ্ধৃত করলাম অংশটুকু।


তখন মধ্যরাত। যেভাবে অপরাপর মধ্যরাতগুলো পড়তে আর লিখতে কেটে যায় আমার, সে রাত ছিলো তার থেকে ভিন্ন - জীবন্ত। ছিলো ভরা পূর্ণিমা; চাঁদ থেকে ঠিকরে বেরুচ্ছিলো আলো। যেন ওরা, জোৎস্নারা, ধাক্কা মারছিলো আমাদের হৃদয়ে কোথাও। আমি সেই আলোয় পড়ছিলাম ‘অনিকেত শামীমের কবিতা’। মনে কৌতুহল জাগলো আমার, অনিকেত শামীম জোৎস্না নিয়ে কবিতা লিখেননি? এ নিয়ে তো অনেকেই লিখেছেন।

উঠোনে বসেই খুঁজলাম। পেলাম না। থাক, না লিখলে আর কী করা! অথবা লিখেছেন কিন্তু এই বইতে অন্তর্ভুক্ত করেননি; হতেও তো পারে। অন্য বই আনবার উদ্দেশ্যে ঘরে যেতে ইচ্ছে করছিলো না অথচ আমার মন তীব্রভাবে চাইছিলো একটা জোৎস্নার কবিতা পড়তে। কিন্তু আমি না উঠেই হাতের বইটি পড়ছিলাম, চোখ বুলাচ্ছিলাম; এর মধ্যেই ‘কত বিনিদ্র রাত্রি’ কবিতার প্রথমাংশ ভাল লেগে গেল! আর উঠতে হলো না আমার, এবং আমি জোৎস্নার কবিতা পড়ার কথা ভুলে গেলাম।


তুমি তো দেখলে না কত বিনিদ্র রাত্রি
পার হয়ে যায় অশ্রুসজল চোখে
এই শিউলিঝরা সকালে
কালের যুবক পেরিয়ে যায় দুঃখের মাইলস্টোন
আকাশে সহস্র তারার মাঝ থেকে
সহসাই একটি নক্ষত্র খসে পড়ে এঁদো ডোবায়

(কত বিনিদ্র রাত্রি)

আমি বিনয়ের কথা ভাবলাম; বিনয় মজুমদার। কবিতা পড়তে পড়তে অনিকেত শামীমের মুখটা মনে পড়ে গেল আমার। ঢাকার দিকে তাকিয়ে তাঁর পুরোনো একটি কবিতা হুবহু মনে করতে চেষ্টা করলাম। পদ্ধতি কাজে এলো। আমি ৩৬০ কিলোমিটার দূর থেকেই তাঁর সাথে কথা বলতে শুরু করলাম। উনি ঘুমুচ্ছেন। আমি একা জেগে আছি। পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণী ঘুমুচ্ছেন। আমার কথামালা জেগে আছে। আমি তাকে তাঁরই কবিতা শোনালাম। কথা হলো অনেক।

এইভাবে আমি রবীন্দ্রনাথের সাথে কথা বলি মাঝে মাঝে; বৃষ ও চিতার সমাবেশে উপস্থিত পাগলের ভূমিকা প্রসঙ্গে আলাপের প্রয়োজন চতুর্থবারেও ফুরোয়নি আমাদের।


এক-দুই বছর আগে অমর একুশে গ্রন্থমেলায় শামীম ভাইকে দেখলাম, দূর থেকে। ভাবলাম, আমাকে দেখে আর চিনতে পাবরেন কী না; আর কাছে গেলাম না। লিটলম্যাগ চত্ত্বরে কয়েকজন বুড়ো কবির সাথে গল্প করছিলেন, লোকের স্টলের সামনে। আমি একা একা ঘুরছিলাম আর বই কিনছিলাম। দেখলাম শামীম ভাইয়ের মুখে বয়সের ছাপ পড়তে শুরু করেছে। সেই আজ থেকে আট/দশ বছর আগে যখন প্রথম দেখেছিলাম, মুখমণ্ডলে ছিল যুবকদ্যুতি। এখন সেই চেহারায় প্রজ্ঞার ছাপ।


দেখা হবার দুই/তিন বছর আগেই শামীম ভাইয়ের সাথে আমার পরিচয় ঘটে। লিটলম্যাগাজিনের খোঁজে আমিই একদিন ফোন করেছিলাম তাঁর দোকান লিটলম্যাগ প্রাঙ্গনে। শামীম ভাই আমার সাথে কথা ব’লে, চাহিদাগুলো শুনেই অনেকগুলো লিটলম্যাগ পাঠিয়েছিলেন। আমার এখন মনে হয়, তাঁর কি একবারও মনে হয়নি যদি এগুলোর টাকা না পাওয়া যায়?

তাঁর মনে এই প্রশ্নের উদয় হয়েছে কী না জানি না। আমার মনে হয়েছে। কখনও সুযোগ হলে জানতে চাইবো।

শুধু ওই একবারই না, এর পর তিনি বহুবার আমার জন্য লিটলম্যাগ পাঠিয়েছেন। প্যাকেটের ভিতরে থাকতো প্রাঙ্গনের ক্যাশ মেমো। আমি মেমোতে উল্লিখিত পরিমাণ দেখে টাকাটা তাঁর মোবাইলে ফ্লেক্সিলোড করে দিতাম। তখন তো আর এখনকার মতো হোম ডেলিভারী/ক্যাশ অন ডেলিভারী/অনলাইন শপিং/বিকাশ পেমেন্ট ইত্যাদি সুবিধা ছিলো না। এইভাবে অসংখ্যবার কিনেছি। শামীম ভাই পরম স্নেহে-ভালোবেসে পাঠিয়েছেন। কোনোদিন টাকা নিয়ে সামান্যতম কথা বাড়ানোর প্রয়োজনই হয়নি।


আজ আমি যতটুকুই বুঝ-জ্ঞান সম্পন্ন হয়েছি; এই যে সামান্য লেখালিখি করছি, এর পেছনে অনেক মানুষের নিঃস্বার্থ সহযোগিতা-ভালোবাসা রয়েছে। শামীম ভাই সেই মানুষজনের মধ্যে একজন। আমি যখন লিটলম্যাগাজিন সম্পর্কে তেমন কিছুই জানি না, কিছু নামধাম শুনেছি মাত্র, ওই সময় তিনি আমায় বাঙলাদেশের প্রায় ৮০ ভাগ উল্লেখযোগ্য লিটলম্যাগাজিনের সাথে পরিচিত করিয়েছেন। কত শত যে লিটলম্যাগাজিন (কখনও সাথে দুই-একটি বইও) তিনি আমাকে পাঠিয়েছেন, তার হিসেব নাই।

এই হেতু আমি শামীম ভাইয়ের কাছে আজীবন কৃতজ্ঞ।


এই সবের কয়েক বছর পরে ২০০৯ বা ২০১০ এ আজিজ মার্কেটে লিটলম্যাগ প্রাঙ্গনে প্রথম দেখা, আড্ডা। ঐ সময় ঢাকায় থাকি; আজিজে নিয়মিত যাতায়াত। লিটলম্যাগ প্রাঙ্গনে যাই; কারও সাথে তেমন কথা বলি না, পরিচিতও হই না; শুধু দেখি - শুধু শুনি - শুধু দেখি; লিটলম্যাগ-বই-পুস্তক ঘাঁটাঘাঁটি করি আর প্রায় প্রতিদিনই কিছু না কিছু কিনি। তখন এখানে চাকুরী করতেন কবি সুদীপ্ত সাঈদ খান; যাকে মানিক ভাই ডাকতাম। তার সাথে পরিচয় হয়। এখানেই শামীম ভাইয়ের সাথে কয়েকদিন আড্ডা দিয়েছি।


শামীম ভাইয়ের পূর্ব প্রকাশিত বই ‘দূরাগত পাহাড়ের গান’ পাঠ করে ব্যক্তিগত ডায়েরীতে লিখেছিলাম, ‘এটি কবির দ্বিতীয় কবিতাবই। পুঁজিবাদ-আগ্রাসন বিরোধীতা, প্রেম, প্রকৃতি প্রভৃতি তাঁর কবিতার বিষয়বস্তু। ভাবের প্রকাশে যে পরিমাণ কাব্যিকতা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি, তাতে যথেষ্ট ঘাটতি আছে। অনেকগুলো পংক্তিতে ছন্দপতনও স্পষ্ট। কিছু কবিতায় অতিসাধারণ কথা-বার্তা অনুজ্জ্বল ভঙ্গিতে প্রকাশিত।’

শামীম ভাইয়ের কবিতা আমাকে টানে না। মানুষটা আমাকে টানে। কৃতজ্ঞতাভরে আমি তাঁর নাম নিই।


২০ অক্টোবর ২০১৭

0 comments: