কালোবাঘ-লালকাক পাশাপাশি শুয়ে থাক


উদ্দেশ্যহীন হাঁটাহাঁটি করাকে গর্হিত মনে করেন, এরকম কিছু মানুষের সাক্ষাৎ পাবার দণ্ড আমার হয়েছিলো! আর শাস্তিস্বরূপ দেয়া হয়েছিলো অজস্র অবান্তর প্রশ্ন। তাই নিরূপায় আমি একবার শুধু বন্ধুর মুখে চেয়ে অকপট ঝেড়েছি শব্দ; ভাবের গাণ্ডীব থেকে।

এ শহর, পথ-ঘাট, এতোটা হেঁটেছি আমি। এ শহর-বন্ধুজন, কতোটা জেনেছি আমি? নিকট শহরে থেকে দূরবর্তী যারা, আসলে তাদের বিষয়ে তেমন কিছুই জানা হয় নি এখনো; রাতভর শুধু পাক পাখিদের শব্দ!

হাাঁটার অভ্যেস হওয়ার পর থেকে আমার বন্ধুরা মেতেছে পায়ের গল্পে। আমি হাঁটতে গিয়ে দেখি পায়ে কিছু ভুল আছে। আমার পা আমাকেই জড়ায় ফাঁদে। পথে শিকারীর অবিকল ওঁত পেতে থাকে নিষেধ আর নিয়মাবলী। আমিও ভুলে যাই পায়ের গ্রামার।
হাাঁটাহাঁটির দিনশেষে অবসরে একদিন মনে হলো পা এক কঠিন পাজল। হাজার বছরের পিছু পিছু হেঁটেছি মাত্র কয়েক কিলো। তারমধ্যে জাড়য়েছে কতো কালি ও ধুলো। পথিকের ছদ্মে এতাদিন রয়ে গেলাম। আমাকে ভাঙিয়ে সবাই কুড়িয়ে নিলো কড়ি ও সেলাম।
আমার দু’পা তারাও চলেছে দূরত্ব বজায় রেখে...
(আমার পা / উপল বড়ুয়া)

২.
মনে ভীষণ জ্বর আর দীর্ঘ ডানা থেকে খসে পড়া ঝড়ো মেঘ নিয়ে থার্মোমিটার খুঁজে বেড়াচ্ছে রঙিন পা-ছাপ। জ্বরের প্রকোপে চুরমার হয়েছে যন্ত্রের কাঁচ। কী দরকার এতো উত্তাপে; আমি বলি কি মেঘের নিচে আসো; বারবার আসো, আসতেই থাকো। মৃদুমন্দ ঝংকার তুলে যথার্থ ছায়াকে গুছিয়ে রেখে - মেঘের নিচে বসো; জিরিয়ে নাও। হাসি পায় না কি বোকার প্রলাপে, বোকা? চেনাজানা কোনো হাসিমুখ আছে কি না, পকেট হাতরাও; দ্যাখো পাও কি না! পাবে না; সবটা ত্যাজ্য হয়েছে পূর্ণ দূষণে আজ।

মেঘের ছায়াতো আন্তর্জাতিক
আর সবচে’ বড় কথা,
ওরা পৃথিবীর সবচেয়ে বড়
স্বাদু-পানির কারখানা
লোনা তাই দুঃখ থাকে না তাতে-
আমাদের ছায়া ও বসবাসে
কতোটা লবণ আছে জানা নাই
আহা! এই সল্টি প্লানেটে যদি
স্বাদু পানি বেশি হতো?
(সল্টি প্লানেট / শামীমফারুক)

৩.
আমার একটা নাম আছে। আমার বন্ধুদেরও, প্রত্যেকের একটা করে নাম আছে। তবে আমার নামের বানানে ভুল আছে। জীবনপুরাণ বলে, বানান ভুল হলে কাছের মানুষও কাচের হয়ে যায়; উপরে তখন কোনো চন্দ্রবিন্দু থাকে না।

কাছের মানুষগুলো কি দিন দিন কাচের হয়ে যাচ্ছে! এর উপরে ভেসে ভেসে বেঁচে আছি একটা স্বতন্ত্র নাম নিয়ে জীবন ও মৃত্যুর মধ্যরেখায়। একটা রেলপথ, একটা স্টেশন; আটকে গেছি এইখানে। আছি। সকলে জানেন। আমার থাকা আর না থাকাজুড়ে একটা ভুল বানানের নাম আছে। মহামান্য বলেন, ভুল হলেও পুরোটা নামে আছে নন্দনের ঘ্রাণ, দৃশ্যত সরল সুন্দর। টিটো ভাই জানেন, মহামান্য মানে নন্দনের বালিকা; সৃজনের ফুল।

মওদুদ নামে বেঁচে আছি জীবিতদের কাছে আর মৃতদের কাছে আছি মরে। নামহীন যায় না তো বাঁচা, মৃতরাও আছে স্ব-নামে। নামফলক তারা ভালোবাসে। ভালোবাসার জন্য, বেঁচে থাকার জন্য, মরে থাকার জন্য নামটাই জরুরী। ভূমিষ্ট হওয়ার আগে, পরে, মরেছে যে শিশু, যার কোন নাম নেই সে তো মরে নেই, বেঁচেও তো নেই। তাহলে নাম মানে আছে, নামহীন মানে নেই। আমি তবে আছি মওদুদ নামে। থাকবো না জানি মওদুদ নামেই।
(দুঃস্বপ্নের চিরস্থায়ী বাগানে-৩৩ / আহমেদ মওদুদ)


৪.
যতোটা শুনেছ তুমি, রসালো স্বাদের প্রেম; জলবৎ তরলং; এইসব জীবন্ত কথামালা ঘুরছে-ফিরছে মেঘেদের মতো। এইসব দলছুট কথাদের ছোটাছুটি থামিবে না কিছুতেই। মৃত্যুসমান বয়সী একেটি শূন্যতা আমার দিকে ঘোড়া হাকিয়ে এসেছিলো; তারপর সবেগে ফিরে গেছে। ফিরে যাওয়া মেঘ - ফেরাতে চাই না আর। যারা ফিরে গেছে তারা জ্যামিতিক হারে দূরে যাক; ছিন্ন জোট অনেক দূরে যাচ্ছে-যাক। শুধু কালোবাঘ-লালকাক পাশাপাশি শুয়ে থাক।

প্রিয় ইমন- ‘প্রেম বোঝেনি
গোরের কবাট খুলে বেড়াল
ছানার মতো উঁকি দেয় লাল মুখ।
তার গা ছুঁয়ে বলি সবুজ পাতার মতো
পরিপুষ্ট করো আমাদের বিষয়-আশয়।
রন্ধ্রে-রন্ধ্রে পৌঁছে দাও সত্যের ক্যালরি
প্রিয় ইমন, প্রেম বোঝো-শসার
সজীবতা নয় চাই তার হলদেটে বীজ।
(দুই / ফরহাদ নাইয়া)

৫.
অকারণ ক্রোধন্মত্ত হচ্ছিলাম কখনো বা। সবকিছু তছনছ করে ফেলতে হতো তখন। নইলে বিস্ফোরিত হতে পারে নিউরণসমগ্র। অথবা স্খলন করতে হয় শরীর শরীরে। সেই সব কিছু না হলে উন্মাতাল গানেই শুধু হৃদয়ের প্রকৃত স্বরের সমতাল হতে পারে।

সতত যৌবন বলে যে ওষধি তুমি খাইয়েছিলে, এতো বিষণ্নতা তাতে;- একবার বললে আমি হাসিমুখে শুয়ে থাকতাম রেললাইনে-শরীর ছড়িয়ে, নক্ষত্র গুনতে গুনতে-ঝিনাইদহগামী হুইসেল শোনার আগমুহূর্তে আমার চৈতন্যের উদয় হতো-কুৎসিত গাল দিয়ে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিতাম ফের...
অভিধান খুলে জেনে নিতাম কাকে বিভ্রম বলে আর ঠিক কাকে ডাকা যায় পতিত-প্লাবন।
(সুইসাইডাল / রাসেল রায়হান)


0 comments: