চিত্রনাট্যঃ শব্দ

চরিত্রগণঃ
একটি কাঠঠোকরা পাখি
মা (পয়ত্রিশ)
বাবা (চল্লিশোর্ধ)
একটি ছেলে ও একটি মেয়ে (দশ-বারো)
তিনজন শ্রমিক (পূর্ণবয়স্ক)
একজন শিশু শ্রমিক (তের-চোদ্দ)

:: দৃশ্য এক ::
[ ছেলেটা স্যান্ডোগেঞ্জি ও হাফপ্যান্ট, মেয়েটি ফ্রক পড়া।
আর পুরো শর্টফিল্ম জুড়ে মা সাধারণ শাড়ি পড়া থাকবে ]

সন্ধ্যা ছয়টা। একটি গ্রামের বাড়ি; বাঁশ ও টিনের মিশেলে তৈরি। দুটো দশ-বারো বছর বয়েসী ছেলেমেয়ে ঘরের বারান্দায় মাদুর বিছিয়ে পড়তে বসেছে। মা রান্নাঘরে কাজ করছেন। বাড়ির গাছে বসে একটা কাঠঠোকরা গর্ত করছে। ঠকঠক শব্দ হচ্ছে। মেয়েটা কী যেন লিখছে খাতায়। ছেলেটা জোড়ে জোড়ে পড়ছে। কাঠঠোকরাটাও জোড়ে জোড়ে শব্দ করছে। ছেলেটা আরো জোড়ে পড়ছে। কাঠঠোকরা আগের মতো জোড়ে শব্দ করেই চলেছে। যেন ছেলেটা আর ঐ কাঠঠোকরার মধ্যে প্রতিযোগীতা চলছে কে জেতে এই নিয়ে! ছেলেটা বুঝে গেছে তার জেতা সম্ভব নয়। ছেলেটা হঠাৎ চিৎকার করে তার মাকে ডাকলো এবং অভিযোগ করলো; ঐ কাঠঠোকরার শব্দে তার পড়তে অসুবিধা হচ্ছে। মা তাড়িয়ে দিল পাখিটাকে। পাখিটা উড়ে চলে গেল।

:: দৃশ্য দুই ::
[ শ্রমিক দু’জন শুধু লুঙ্গি আর মহাজন (বাবা) চতুর্থ দৃশ্য পর্যন্ত লুঙ্গি ও ব্যাপারী শার্ট পড়া থাকবে ]

রাত্রি আটটা। একটা চলন্ত চাউলকল। দু’জন শ্রমিক কাজ করছে মেশিনের। দিনশেষের কাজ চলছে এখন। ঘরঘর শব্দ হচ্ছে খুব। মহাজনের আসনে বসে আছে একটা লোক। ইনি ছেলেমেয়ে দুটোর বাবা। সারাদিনের আয়-ব্যায়ের হিসেব মেলাচ্ছেন খুব মনোযোগ দিয়ে। এমন সময় মোবাইলটা বেজে উঠল তার। রিংটোনের শব্দে মনোযোগ নষ্ট হল বলে বিরক্তি প্রকাশ করলেন। ফোনটা রিসিভ করে ব্যবসা সংক্রান্ত আলোচনা করলেন। কথা শেষ করে আবারো হিসাব মেলানোতে মন দিলেন। মেশিন তখনো চলছে, ঘরঘর ঘরঘর।

:: দৃশ্য তিন ::
রাত্রি দশটা। বাড়ির গাছে বসে একটা কাঠঠোকরা গর্ত করছে। ঠকঠক শব্দ হচ্ছে। ঘরের বারান্দায় মাদুর বিছানোই আছে। ছেলেমেয়ে দুটো নেই। মাদুরে তাদের মা বসে কিছু একটা সেলাই করছেন। এমন সময় ছেলেমেয়ে দুটোর বাবা চলে এলেন। খুব ক্লান্ত শরীরে ঘরে ঢুকে জামাকাপড় ছাড়ছেন। মা তার কাজ গুটিয়ে স্বামীর কাছে চলে গেলেন। হঠাৎ রেগে চিৎকার করলেন বাবা, রাগটা মাকেই করলেন, কাঠঠোকরার ঠকঠক শব্দে তার মাথা ধরেছে। মায়ের অপরাধ, তিনি আগেই কেন তাড়িয়ে দেননি। মা দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন আর কাঠঠোকরাটাকে তাড়িয়ে দিলেন।

:: দৃশ্য চার ::
[ ছেলেমেয়ে দুটো ইস্কুলের পোষাক পড়া থাকবে ]

সকাল সাড়ে নয়টা। মা ছোটাছুটি করে বাড়ির কাজ করছেন। ছেলেমেয়ে দুটো ইস্কুলের প্রস্তুতি নিয়ে বের হচ্ছে। বাবা চাউলকলে যাচ্ছে। কাঠঠোকরাটা ঠকঠক করে গর্ত করছে। সেটাকে তাড়িয়ে দিয়ে বাবা ছেলেমেয়েদের নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। ইস্কুলে রেখে তারপর চাউলকলে যাবেন।

:: দৃশ্য পাঁচ ::
দুপুর বারোটা। বাড়িতে কাজ করছেন মা। বোঝাই যায় এখন অতো তাড়া নেই। ধীরেসুস্থে কাজ করছেন তিনি। বাড়ির গাছে বসে কাঠঠোকরা গর্ত করছে। ঠকঠক শব্দ হচ্ছে। সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপই নেই তার। নিজের মতো কাজ করেই চলেছেন তিনি। কাজের পাশাপাশি কাঠঠোকরার ঠকঠক শব্দ যেন একটা আমোদিত পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। কাজ করছেন, হাত নাড়ছেন, ছুটছেন; এমনভাবে, মনে হচ্ছে যেন কাঠঠোকরার শব্দের তালে তাল মেলাচ্ছেন!

:: দৃশ্য ছয় ::
[ দৃশ্য চার-এ ছেলেমেয়ে দুটোর পোষাকের পুনরাবৃত্তি। 
তবে খেলা শুরুর সময় দৃশ্য এক-এর পোষাক থাকবে ]

দুপুর দেড়টা। ছেলেমেয়ে দুটো ইস্কুল থেকে বাড়িতে ফিরলো বৃহস্পতিবার বলে। মা বাড়ির কাজ করছেন। বাবা বাসায় নেই। বাড়ির গাছে বসে একটা কাঠঠোকরা গর্ত করছে। ঠকঠক শব্দ হচ্ছে। ছেলেটা এই শব্দের প্রতি তার বিরক্তি প্রকাশ করলো মেয়েটার কাছে। মেয়েটাও একই কথা বলে তার বিরক্তির প্রতি সংহতি জানালো। এরপর ছেলেটা একটা ইটের টুকরো নিয়ে ঢিল ছুড়লো পাখিটার দিকে। পাখিটা উড়ে গেল। ছেলেমেয়ে দুটো কাপড় বদলে খেলতে শুরু করল।


:: দৃশ্য সাত ::
[ মহাজন ও শ্রমিকরা দৃশ্য দুই-এর পোষাক পড়া থাকবে, তবে শিশু শ্রমিকটি শুধু হাফপ্যান্ট পড়বে ]

বিকেল চারটা। চাউলকলে কিছু ভাঙা হচ্ছে। ঘরঘর ঘরঘর প্রচন্ড শব্দে মেশিন চলছে। কাজ করছে তিনজন বড় ও একটি শিশু শ্রমিক। রাস্তা দিয়ে লোকজন কানে হাত দিয়ে যাওয়া আসা করছে। গদিতে শুয়ে আছেন মহাজন। অলস বিকেলে বসে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে পড়েছেন। নাক ডাকছেন এমনভাবে মনে হচ্ছে যেন মেশিনের শব্দের সুরে সুর মেলাচ্ছেন।

:: দৃশ্য আট ::
[ ছেলেমেয়ে দুটোর পোষাক দৃশ্য এক এর পুনরাবৃত্তি ]

সন্ধ্যা ছয়টা। ছেলেমেয়ে দুটো ঘরের বারান্দায় পড়তে বসেছে। মা রান্নাঘরে কাজ করছেন। বাড়ির গাছে বসে কাঠঠোকরাটা গর্ত করছে। ঠকঠক শব্দ হচ্ছে। মেয়েটা প্রথম বিরক্তি প্রকাশ করাতে ছেলেটা হঠাৎ পড়া থেকে উঠে গিয়ে একটা ইটের টুকরো নিয়ে ঢিল ছুঁড়লো পাখিটার দিকে। পাখিটা উড়ে চলে গেল। ছেলেমেয়ে দুটো পড়তে বসলো। মা কাজ করতে থাকলেন।

:: দৃশ্য নয় ::
[ দশম দৃশ্য পর্যন্ত বাবা শুধু লুঙ্গি পড়ে থাকবে ]

রাত্রি সাড়ে দশটা। বাবা চলে এসেছেন চাউলকল থেকে। ছেলেমেয়ে দুটো ইতোমধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছে। খাওয়া শেষ করে মা-বাবাও ঘুমিয়ে পড়লেন। ঘুমানোর আধঘন্টা পর  এলো পাখিটা। সেই পুরনো জায়গাতেই ঠকঠক শব্দ করে গর্ত করতে লাগলো। সেই শব্দে হঠাত ঘুম ভেঙে গেল বাবার। তিনি রেগেমেগে বিরক্তিপ্রকাশ করে উঠে গেলেন যেন পাখিটাকে পেটাবেন। মায়েরও ঘুম ভেঙেছে, তবে সেটা কাঠঠোকরার শব্দে নয়, বাবার গলার আওয়াজে। পাখিটাকে তাড়িয়ে দিলেন বাবা। উড়ে গেল। আবারো সবাই ঘুমিয়ে পড়লো।

:: দৃশ্য দশ ::
[ দৃশ্য এগার পর্যন্ত ছেলেমেয়ে দুটো দৃশ্য এক এর অনুরূপ পোষাক পড়বে ]

শুক্রবার। সকাল দশটা। কারো কোথাও যাবার তাড়া নেই। বারান্দায় মাদুরে বাবা বসে আছেন অলসভাবে। ছেলেমেয়ে দুটো পড়া শেষ করে উঠলো খেলবে বলে। মা খাবারের বন্দোবস্ত করছেন। এমন সময় কাঠঠোকরাটা এলো। কিছুক্ষণ কেউ ভ্রুক্ষেপই করলো না। তারপর বাবা উঠে তাড়িয়ে দিলেন। পাখিটা উড়ে গেল। যে যার মতো কাজ করতে থাকলো।

এভাবেই কয়েকদিন চলার পর...

:: দৃশ্য এগার ::
সন্ধ্যা ছয়টা। ছেলেমেয়ে দুটো ঘরের বারান্দায় মাদুর বিছিয়ে পড়তে বসেছে। মা রান্নাঘরে কাজ করছে। বাড়ির গাছে বসে কাঠঠোকরাটা গর্ত করছে। ঠকঠক শব্দ হচ্ছে। ছেলেমেয়ে দুটো জোড়ে জোড়ে পড়ছে। কাঠঠোকরাটাও জোড়ে জোড়ে শব্দ করছে। ছেলেমেয়ে দুটো জোড়ে পড়ছে। কাঠঠোকরাও আগের মতো জোড়ে শব্দ করেই চলেছে। সেদিকে কারো ভ্রুক্ষেপই নেই। অথচ এমনভাবে ওদের পড়া আর মায়ের কাজ চলছে যেন কাঠঠোকরার শব্দের তালে তালে কাজ এগিয়ে যাচ্ছে।

:: দৃশ্য বারো ::
[ বাবা লুঙ্গি আর ব্যাপারী শার্ট পড়া, তবে শোবার সময় শুধু লুঙ্গি পড়া থাকবে ]

রাত্রি দশটা। বাড়ির গাছে বসে একটা কাঠঠোকরা গর্ত করছে। ঠকঠক শব্দ হচ্ছে। ঘরের বারান্দায় মাদুর বিছানোই আছে। ছেলেমেয়ে দুটো নেই। ইতোমধ্যেই তারা খাওয়া সেরে ঘুমিয়ে পড়েছে। মাদুরে তাদের মা বসে কিছু একটা সেলাই করছেন। এমন সময় ছেলেমেয়ে দুটোর বাবা চলে এলেন। খুব ক্লান্ত শরীরে ঘরে ঢুকে জামাকাপড় ছাড়ছেন। মা তার কাজ গুটিয়ে স্বামীর কাছে চলে গেলেন। তারপর একসাথে খেয়ে শুয়ে পড়লেন। কাঠঠোকরাটা তখনও আগের মতো ঠকঠক শব্দ করেই চলেছে।

:: দৃশ্য তের ::
[ চতুর্থ দৃশ্যেও পোষাকের পুনরাবৃত্তি ]

সকাল সাড়ে নয়টা। শুনশান পরিবেশ। শূণ্যতা তৈরির মতো নীরবতা। ছেলেমেয়ে দুটো আর বাবা বাইরে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। মা বাড়ির কাজ করছে। (কিন্তু কাজে আগের সেই গতিটা আর দেখা যায় না। কেমন যেন একটু ধীর গতি বা এলোমেলার মতো মনে হয়।) প্রস্তুতি শেষ। ছেলেমেয়ে দুটো বের হচ্ছে। বাবা বের হচ্ছেন। ইস্কুলে দেরি হবে বলে মা চিৎকার করে দ্রুত বেরিয়ে যেতে বলছেন ছেলেমেয়ে দুটোকে। তারা বেরিয়ে যেতে যেতে তাকিয়ে আছে গাছটার সেই গর্তটার দিকে। বাবা বেরিয়ে যাবার সময় একবার শুধু তাকালেন গাছের ঐ গর্তটার দিকে। পাখিটা আজ আসেনি।

:: দৃশ্য চোদ্দ ::
দুপুর বারোটা। মা কাজ করছেন। পুরো বাড়ি জুড়ে কেমন একটা নীরবতা। কাজ করতে করতে তিনি একবার তাকালেন গাছের দিকে, গর্তের দিকে। পাখিটা আজ আসেনি।

:: দৃশ্য পনের ::
[ ছেলেটা হাফপ্যান্ট আর মেয়েটা ফ্রকের মতো একটা পোষাক পড়া থাকবে ]

বিকেল পাঁচটা। শুনসান নীরবতা। ছেলেমেয়ে দুটো বাড়িতে খেলছে। মাঝে মাঝে দুজনেই তাকাচ্ছে গর্তটার দিকে। পাখিটা আজ আসেনি।

:: দৃশ্য ষোল ::
[ দৃশ্য পনের এর পোষাকের পুনরাবৃত্তি। শুধু ছেলেটা প্যান্টের সাথে স্যান্ডোগেঞ্জি পড়া থাকবে ]

সন্ধ্যা সাতটা। ছেলেমেয়ে দুটো পড়তে শুরু করছে। প্রথমে পড়তে শুরু করলো ছেলেটা। আগেকার মতো স্বাভাবিক জোড়ে পড়তেই কেমন যেন খুব জোরে আওয়াজ বলে মনে হল তার কাছে। আবার পড়তে শুরু করলো। আবারো তেমনই মনে হল। হঠাৎ কী মনে করে গাছটার দিকে, গর্তটার দিকে তাকালো সে। পাখিটা আজ আসেনি।

:: দৃশ্য সতের ::
[ বাবা আসার সময় ব্যাপারী শার্ট ও লুঙ্গি, আর পরে শুধু লুঙ্গি পড়া থাকবেন ]

রাত সাড়ে নয়টা। শুনসান নীরবতা। ছেলেমেয়ে দুটো খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে আগেই। মা মাদুরে শুয়ে আছেন। বাবা এলেন। খাওয়া সেরে দুজনেই বারান্দায় মাদুরে বসলেন। পরস্পর দু-চারটে কথা বলেই চুপচাপ দুজনেই তাকিয়ে রইলেন গাছটার দিকে, গর্তটার দিকে। পাখিটা আর আসবেনা।


রচনাকালঃ ২২ আগস্ট ২০১৪ খ্রি.
প্রকাশঃ ফরহাদ নাইয়া সম্পাদিত লিটলম্যাগ 'হারপুন' (২০১৭)

২টি মন্তব্য: