মুখোশের রঙ চটে গেছে ম্যাডাম, পাল্টে নিন

ছবিঃ  Raganas-vesture-1.jpg (সোর্স লিংক)


ক.
  • ধরেন, যুদ্ধের ময়দান, যুদ্ধ চলতেছে। আপনি যোদ্ধাদের গিয়া বললেন, ‌'নোবেল পুরস্কার দেয়ার জন্য বব ডিলানকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।'  কেমনটা লাগবে?
  • ধরেন, দুই হাজার সাঁওতালের বাড়িতে ক্ষমতাসীনদের ইন্ধনে ও প্রশাসনের নীরব ভূমিকায় আগুন দেয়া হইছে, তাঁরা উদ্বাস্তু অবস্থায় আছে। আপনি তাদেরকে গিয়া বললেন, 'উন্নত দেশগুলার মতো আমাদের সরকারও হেল্পলাইন চালু করছে, ৯৯৯ এ ফোন করে আপনি...।' কেমনটা লাগবে?
  • ধরেন, দিলীপ এখনো বিনা বিচারে আটক আছে। তার কাছে গিয়া আপনি বললেন, '৫৪ ধারা তো বাতিল করছে, ওয়ারেন্ট ছাড়া এখন কাউকে ধরতে পারবে না।' কেমনটা লাগবে?
  • ধরেন, কল্পণা চাকমার বাড়িতে গিয়া আপনি বললেন, 'বর্তমান সরকার তো প্রগতিশীল সরকার, বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাসী সরকার। তাই আমরা এত সুখে আছি। অন্য সরকার ক্ষমতায় আসলে কচুকাটা করবে।' কেমনটা লাগবে?
  • ধরেন, এই দেশে এনজিও প্রোজেক্ট ও কর্মক্ষেত্র বন্ধ হয়ে হাজার হাজার মধ্যবিত্ত কাজহীন হয়ে বেকার বসে আছে। খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছে। তার কাছে গিয়া আপনে বললেন, 'বাঙলাদেশ তো মধ্যম আয়ের দেশে উত্তীর্ণ হয়েছে। দেশের নাগরিকের গড় আয় এখন ...ডলার।' কেমনটা লাগবে?
  • ধরেন, লেখক-বুদ্ধিজীবীদের, যারা হুমকীর শিকার, তাদের গিয়ে আপনি বললেন, 'এই সরকার বিজ্ঞান-গবেষণায় উৎসাহী প্রগতিশীল সরকার। তাই তো বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে শুধু উন্নয়ন আর উন্নয়ন।' কেমনটা লাগবে?



খ.
যতো দিন যাচ্ছে, দেশের পরিস্থিতি খারাপ থেকে খারাপতর হচ্ছে! ক্ষমতাসীন পক্ষের ফ্যাসিবাদি আচরণ বাড়তে বাড়তে এমন পর্যায়ে চলে যাচ্ছে যে, দেশের সংখ্যাগরিষ্ট শিক্ষক > সাংবাদিক > কবি > বুদ্ধিজীবী ল্যাজ লড়বড় করতে করতে দালালীর খোয়াড়ে ঢুকে যাচ্ছে! শুধু বিদ্রোহই ন্যায়সঙ্গত। রাষ্ট্রবিরোধীতাই ন্যায়সঙ্গত।

একদা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে বর্ম হিসেবে ব্যবহার করতো আওয়ামী লীগ। প্রগতিশীলতার লেবাস ধরে থাকতো। এখন আর সেই সুযোগ নাই। মুখোশের রঙ চটে গেছে। ছেঁড়াখোড়া মুখোশ ভেদ করে প্রকৃত চেহারা বেরিয়ে পড়েছে। কয়েকদিন থেকে একটা সংবাদ চোখের সামনে ঘোরাফেরা করছে খুবঃ দুইশত সাঁওতাল পরিবার খোলা আকাশের নিচে। তাদের বাড়ি লুট করা হয়েছে। কোথাও কোনও বিচার নাই। কে কার বিচার করবে? অপরাধীর কাছে অপরাধের বিচার চাওয়াকেই এখন ভণ্ডামী মনে হয়। কমরেড জসীম মণ্ডল একটা ভালো কথা বলেছেনঃ 'কোনও শালার আইন মানা হবে না। ব্রিটিশের আইন মানি নাই। পাকিস্তানের আইন মানি নাই। এই দেশের আইনও মানা হবে না।'

এইটা আইন মানার সময় না। নির্লজ্জ্ব দালালীর সময় না। প্রতিটি ধর্মীয়, জাতিসত্ত্বা আক্রান্ত। কোথাও কেউ ভালো নাই। যারা ভাবছেন ভাল আছেন, আসলে তারাও ভাল নাই। অপরাধীর সাথে আপোষের কোনও সুযোগ নাই।

গ.
দেশের মিডিয়াগুলো আমেরিকার নির্বাচন সম্প্রচারে উঠে-পড়ে লাগে ৷ ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় দিন-রাত প্রচার হয় একই সংবাদ। অথচ রংপুরে পুলিশ দিনে-দুপুরে ভূমি রক্ষার আন্দোলনকারীদের গুলি করলে সেই খবর কোথাও নাই; সাঁওতালদের উপর হামলা-লুটপাট-উচ্ছেদের ঘটনাটা যথার্থ গুরুত্বসহ ছিল কি সংবাদে?

দেশের মিডিয়াগুলো এখন বিটিভির মতোই চূড়ান্ত প্রতিবন্ধী অবস্থার দিকে যাত্রা শুরু করেছে; সম্ভবত গণমাধ্যম নীতিমালার কারণে। কিছুদিন আগে সরকারপক্ষ রামপাল কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র প্রসঙ্গে মিথ্যা প্রচারণা চালাতে সাংবাদিক সম্মেলন আয়োজন করেছিলো মনে আছে তো? সেই সম্মেলনে সাংবাদিকগুলোর কথা শুনে মনে হচ্ছিলো, এরা প্রশ্ন করতে তো আসে নাই, মিথ্যাচারের প্রচারণা অংশ নিতে এসেছে। যাই হোক, এই মিডিয়া এখন মনে করছে দেশের দুর্দশার সংবাদ প্রচারে শাসকদল অসন্তুষ্ট হতে পারে। তাই আমেরিকার সংবাদ প্রচারই আরাম। এইটা বুঝলাম। কিন্তু একটা জিনিশ বুঝতেছি না। ফেইসবুকে উল্লেখসংখ্যক মানুষ কেন এই গুয়ের গাদায় মাথা ঢুকালো?

  • সাঁওতালপল্লীতে আগুন দিছে দফায় দফায়, জানেন?
  • ধর্ষণ প্রতিদিন চলছেই,জানেন?
  • ৪৯ বছরে প্রতিদিন গড়ে প্রায় সাড়ে ছয়শত হিন্দু ধর্মাবলম্বী দেশত্যাগ করেছে, জানেন?
  • লেখকহত্যার মাস আসতেছে, জানেনই তো!..


ঘ.
প্রাথমিক ইস্কুলের একাডেমিক বই দেখুন, অবাক হয়ে যাবেন, প্রায় প্রত্যেকটা বইয়ে বর্তমান সরকারের গুণকীর্তন মুখস্ত করতে হচ্ছে ছাত্রদের! সরকারের অবদান মুখস্ত করতেছে! এইসব পরীক্ষায় লিখে দিয়ে আসবে!

এদেশের শাসকশ্রেণি 'অবিকশিত বুর্জোয়া' হওয়ায়, নিজের স্বার্থও বোঝার ক্ষমতাহীন। একটা দেশের অগ্রগতির জন্য ভাল শিক্ষক, চিকিৎসক, বুদ্ধিজীবী, ইঞ্জিনিয়ার তৈরির গুরুত্ব বুঝতে তারা অক্ষম। এরা শুধু দালাল তৈরি করতে চায়। প্রাথমিক শিক্ষা থেকে, একদম প্রথম শ্রেণি থেকেই বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী, খণ্ডিত চিন্তাকর্মী উৎপাদন করছে এরা। ফলে আগামী দিনে আমরা এমন চিকিৎসক পাবো, যারা বই খুলে রোগীর চিকিৎসা করবে। আবার, কোন বই দেখে চিকিৎসা করবে? চিকিৎসাবিজ্ঞান নিয়ে বাঙলাদেশে ছাপা বই? হয়তো সেখানেও দেখা যাবে, চিকিৎসা নিয়ে কোনো কথা থাকবে না, সেখানে লেখা থাকবেঃ 'বিগত সরকারের আমলে দেশে সরকারি হাসপাতালের পরিমান ছিলো ড্যাশ টি, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর আরো ড্যাশড্যাশ টি হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়েছে। উন্নত সরঞ্জাম কেনা হয়েছে। এ এক অন্যতম মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। এখন আর একজন মানুষেরও বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু হয় না। তাই এই সরকার ড্যাশ ড্যাশ ড্যাশ ড্যাশ'

ঙ.
উৎপাদন, শিক্ষা, চিকিৎসা সহ যে ব্যবস্থার কথাই বলুন না কেন এই দেশের, ধ্বসে গেছে। ঘুনপোকা ফাঁকা করে দিয়েছে, এখন শুধু বাহিরে যা দেখতে পাইতেছেন, চকচক করিতেছে, জেনে রাখুন এইটুকুই অবশিষ্টাংশ, (জানেন তোঃ যাহা স্বর্ণ নয় তাহাই আজকাল স্বর্ণের মতো দেখায়)।
অবিকশিত ক্ষমতার নির্লজ্জ্ব দালালী ক'রে ক'রে সংখ্যাগরিষ্ঠ বুদ্ধিজীবীর (কবি > লেখক > সাহিত্যিক > শিল্পী > সংস্কৃতিকর্মী, শিক্ষক, অন্যান্য) কী নির্মম দুর্দশা ভাবুন একবার! জনগণ কোথায় দাঁড়াবে, কোন পাটাতনে, কার সাথে? কার উপর ভরসা? চারিদিকে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী ডান-বাম-উত্তর-দক্ষিণ। রামপালের কয়লায় মাজা দাঁত কেলিয়ে বলে, পালাবি কোথায়?

পুরো ব্যবস্থা ঘুনে ধরেছে, জোরে একটা লাত্থি দিয়ে একে ভেঙে না ফেলা পর্যন্ত খুন, ধর্ষণ, ভূমি দখল, উচ্ছেদ, লুটপাট চলতেই থাকবে। ক্ষমতা দখল করেছেই এরা এইসব করতে। তাই আমগাছে কাঁঠাল আশা করে লাভ নাই। প্রতিদিনই চলছে ধর্ষণ; হিন্দু, বৌদ্ধ, আদিবাসী, পাহাড়িদের উপর হামলা ও লুটপাট। কে বা কারা এইসব করছে তা আজ প্রমাণিত। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত, জাতীয় পার্টি সহ প্রত্যেকটি বুর্জোয়া দলের চরিত্র অভিন্ন। এরাই বাঙলাদেশকে পাকিস্তানের মতো একটি ব্যর্থরাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়।

রচনাঃ ১ ডিসেম্বর ২০১৬


0 comments: