শাদা অন্ধকারে অন্য মন্ত্র


আমাদের সামনে শুধু শাদা অন্ধকার ─ সূর্যোদয়ে আজ আর আমাদের কিছুই আসে না
গোধূলি বিদায় নিলে ভেঁপু বাজে ‘এম ভি শীলা’র ─ তবু শরতে হেমন্তে কেন
আমরা জাগি না কেউ!
(শাদা অন্ধকার)

সীমান্তে আলোর ধারা তুমি, ইবাদতে কী করবে! কাঁটাতার, প্রতিটি শিরায় পঁচে যাওয়া রক্তের গন্ধ। ঐ পারে সুখের বিন্দু কি দেখা যায়? কোথাও কি বেহেশতের চিহ্নটি দেখা যায়? তোমার শরীরের ভাঁজে অবিনাশী প্রেম ও যাতনা, বারবার টের পাই। অভিমানে কী করবে আর, ছবিটবি আঁকো। নীরীক্ষণের জন্য এর চে’ উত্তম শরীর আর পাবে না সকলে জানে; তবুও বন্ধ চোখে অসীম সুখের খোঁজে, ডুবে যায়..

হাজার বয়সী যুবা হুর হয়ে আছে
পরাজিত তার কাছে দুনিয়াবি নারী
সতীনের ঘরে ঘরে মাশুকের যাওয়া আর আসা
বেহেশত মানে এক হারাম দুনিয়া?
(দ্যুলোক/অন্য মন্ত্র)

কতোদিন ঝরে ঝরে ফুরিয়ে গেছে পাথরের বীণা। ছিলো যখন প্রবল ঝংকারে, কার ইশারায় ধ্বণিত হতো সে, কার আমন্ত্রণে। এই যে পৃথিবী─সবার সঙ্গে মিশে যায়;─ শাদা অন্ধকার নেমে আসে পৃথিবীতে শ্রাবণ মাসজুড়ে। যদি ফিরে পাই সত্যি আগুনের দোলা বুকের ভেতরে ফের, শাদাশঙ্খের গানগুলো চুঁইয়ে পড়া উচ্ছ্বসিত বিষ্টি, তাহলেই জানা যাবে কতোটা আগুন জমিয়ে রেখেছে শ্রাবণপাখি।

কোন গোলাপী কনের বিয়ে কে করেছে দান
বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর নদেয় নাহি বান
শ্রাবণ বুকে আগুন পোষে হয় না ধারাপাত
সারাটা মাস পার হলো সে ছিটিয়ে কেবল থুতু
শ্রাবণের এই বুকে সত্যি আগুন কিছু আছে?
(শ্রাবণের থুতু/অন্য মন্ত্র)


কোথায় হারাচ্ছো পরী। কোথায় গড়ছো আবাস। পুরোনো বকুলে কোনও গন্ধরেণু নাই। একদা যে পাখিগুচ্ছ নদীর ধারে প্রার্থনাগীতি গাইতো , তাদের অভিজ্ঞানে সকল ঢেউ কুলে পৌঁছতে পারে না কখনও। সংকট ও সম্মোহনে নিকটবর্তী শালিক ধীর মন্দ্র স্বরে কাছে এসে চলে যায়। ভীষণ দূরত্ব জাগে─মিলিয়ে যায়। মগডাল সমীপে তুমুল উড়াউড়ি আবদ্ধ! অক্ষরস্তম্ভে দাঁড়িয়ে, প্রভিন্ন পৌনঃপুনিক।

দুয়ারে গাড়ির প্রস্তুতি কার দ্বিপ্রহরে জানা নেই
যেতে দিতে হলো ঊন-প্রস্তুত রথে
নিয়তিকে মানা দায়
যেতে তবু দিতে হয়
তবু চলে চলে যায়
(প্রস্থান/অন্য মন্ত্র)

মনে যা আসে সব নামিয়ে ফেল। কাঞ্চনগাছের ছায়ায় রেখে দাও সমূহ আযানের ধ্বণি। অভিমানে ঘর ছাড়া ফড়িং একদিকে চকচকে নদীর সোনালী ধূসর শীর্ষপথে চলে গেছে বুঝি! বিস্তীর্ণ কবিতাভূমি ক্রমে ঢেকে যায় প্রকৃত অন্ধকারে। আলোর সকল দীনতা ভেতরেই সজীব-প্রাণবন্ত, দুর্নিবার। আমার বন্ধু পরোপকারী ট্রেন, সর্বত্র গান গেয়ে বেড়ায়।

কাগজে কবিতা নেই, বিজু’র দোকানে নেই, ‘প্যানটেক্স’ বন্ধ আর
সংসদ ভবনে আলো আঁধারিও তোমাকে টানে না বুঝি!
সবুজের এক কোণে বুঁদ বসে থাকা ঝাঁকড়া বাবরি নেই
মেথর পট্টিতে নেই
নেই তুমি গোঁয়াছি বাগানে
লিরিকেও নেই তুমি আজ।
তবে কি পেয়েছো তুমি হৃদয়ের আসল ঠিকানা? কবিতার?
(নিখোঁজ কবি/ শাদা অন্ধকার)

আমি প্রস্তুতি নিয়ে একটা কবিতা লিখতে বসেছিলাম। একটা নামও ঠিক করেছিলাম, মাতালন্ত। কিন্তু লেখা হলো না এখনও। প্রস্তুতি নিয়ে প্রেম হয় না বুঝি! কামান-জল তো সবই প্রস্তুত, শুধু বৃক্ষ জন্মালো না কিছু। কী কা- বাপু, কী অবাক কা- দেখুন! সামান্য বৃক্ষ তবু ভিন্ন আঙ্গিকে জাগলো না অন্যত্র। যেন পূর্বপুরুষের ভিটে তার। মানুষ অনাহূত, অনাকাক্সিক্ষত জঞ্জালসমগ্র। কে করিবে উচ্ছেদ আহা শেখের জঞ্জাল!

তারপর আমাদের পায়েরা এগুলো সুবিশাল কীত্তনখোলার দিকে। কী বিমল বাতাসে ভরেছে বুক। নৌকার মাঝি আনমনে গায় ভাটিয়ালি। যুবকেরা আড্ডা জমালো আঁধারের সাথে সাথে। খিস্তিও শুনেছি কিছু হঠাৎ বাতাসে। সেদিনের দমকা উড়িয়ে নিয়েছে সব কালো আর ধবল মেঘ ─ আকাশের, হৃদয়ের...
(কবির দেশে/শাদা অন্ধকার)

বেঁচে কি আছি আদৌ; না কি মরহুম মনটাকে বহন করে চলি! ওগো হাওয়া, মৌসুমী বায়ুর কোলাহলে জাগে আমার বাড়িতে ছোটনদী। ছোট্ট নদীটা ফের, দীর্ঘ দিন বাদে; ভাঙা পাড়─ধূলিপথ মিলিয়ে গেছে লজ্জায়। ঐ পথের স্মৃতিকথা রবিবাবু লিখেছেন ছোটনদী কবিতায়। কৈয়ের দোকান খুলেছে একজন। তার থেকে দূরত্ব রেখেছি আমি। কীসের প্রেম আমার মৎস্যশিকারীর সাথে! কীভাবে অবগাহন!

আমাকে আমার মতো বাঁচতে দিলে যদি
কলির যিসাস হয়ে আত্মা দেবো দেহে
এখন স্মৃতির খোলে আত্মা জাদুঘরে
কেবল দেহের শব চলে ফিরে দেশ মাঠ ঘাট।
নীতির সফেদ রুহ বখিলার দেশে পরবাসী
বাঁচার প্রবল শর্তে অর্থহীন আমি বর্তমান।
(বাঁচার প্রবল শর্তে/শাদা অন্ধকার)

সে আসে─আনন্দে আকাশ জুড়ে শাদাপালক মেলে। অন্য কোনও নামে তাকে চিনি, প্রত্যেকে। অভিন্ন একক তবু আছে উল্টোমুদ্রায়ও। দিনচক্রে সবুজ গাঁয়ের নাম লেখা নদীর পরিচয় হারিয়ে যায়। মাটির দীঘল পথে দানবেরও মুখ চেনা দায়; মুখোশ সরাও প্রিয়─ আমি তোমার মুখটা দেখতে চাই। নিঝুম চোখদুটো─ঠিকরে আসা নীলরঙ পৃথিবীর ছবি দেখতে চাই। বিনীত অনুরোধ যতো লীন হয়ে যাক, সুদূর বাজনা হারা বাদকের ম্লান আকাশ আমাকে দেখতেই হবে।

চারপাশে নিতান্ত ইমেজ শুধু আমাকে জড়িয়ে ডাকে
‘কেবলই প্লাস্টি হও, ফ্যান্টাস্টিক হও’
মুখোশে শ্রমণ ঢাকা, হৃদয় মন্দির জুড়ে সিডরিক ভরত নাট্যম ককটেল তৃপ্তি ....
বোধের বিকল্প বুঝি কৌশল ─ চাতুরি ─ রোডম্যাপ
হৃদয়ের উষ্ণতা না, মাপকাঠি আজ সারফেস ─ টেক্সচার ─ মুখোশ-মুখোশ
বহুবিধ রূপকের আমি এক ঝাপসা একক
বোধহীন আধা জাগরুক স্বপ্নভুক, জীবনের জালে মোড়া....
(জালে জটাজালে/শাদা অন্ধকার)

প্রতিবার; সত্যি কথা বলি─ প্রত্যেকটা বছর ভাবতে থাকি লালনের ডেরায় যাবো; অথচ একটা বারও যাওয়া হলো না। যাবো হয়তো একদিন; অথবা যাবো না কখনোই; হয়ত হবেই না যাওয়া। মনের ভিতরে কীভাবে প্রবেশ করবি মন? স্বপ্নাদ্য আঙুলে স্বর আছে, নিমিঝিমি আলোয় বসে আছে আমার লালন। উন্মাতাল পোড়াকাঠে, আদাগন্ধে, আবছা ভালোবাসার মতো যে উড্ডয়ন নামছে সিক্তচুলে, তার সাথে গান হবে খুব, প্রেমে।

লালনের ডেরা থেকে নদীতে ভাসে নৌকা ─ শিলাইদহ ঘাটে আমাদের প্রথম পদচ্ছাপ। ভ্যান গাড়িতে পা দুলিয়ে দু’বন্ধুর নিরব আলাপ ─ মেঠা পথ ─ লাল মরিচের গালিচা বিছানো আবাহন! পৌঁছে দিলো শান বাঁধানো পুকুর ঘাটে ─ দূরে লাল কুঠিবাড়ি ─ ধীরে অতি ফেলেছি তো পা ─ পাতার শব্দের ফাঁকে বেজে ওঠে চেয়ারের পায়া ......
তুমি কি রয়েছো কবি অন্তরালে? তোমার নিঃশ্বাস আমাকে গিয়েছে ছুঁয়ে..... আমি আর তোমাকে অতিক্রম করতে পারি না।
(শিলাইদহের যাত্রী/শাদা অন্ধকার)

আকাশ দেখে আশ্চর্য হওয়া মানুষের অনিবার্য কর্ম না কি! আদি থেকেই মানুষ আকাশ নিয়ে গভীর মগ্নতায় দিন কাটিয়েছে। চর্যাপদেও এ বিষয়ের উল্লেখ পাওয়া যায়। শুধু কি আকাশ-নীল? আকাশের প্রতিটি উপাদান মানুষকে গভীর চিন্তিত করেছে প্রতিটি সময়খণ্ডে। মেঘ নিয়ে কি ভাবনার অবশেষ আছে? সেই মেঘ, সবুজমেঘ, আহা মেঘ, ওহ্ মেঘ, উত্তরের মেঘ, কালো মেঘ, মেঘদূত, মেঘের অবয়ব..  ‘আমি ভালোবাসি আশ্চর্য মেঘদল’..

মেঘের নানান রঙে ভালোবাসা মাখা
বৃষ্টি ধারা ধুয়ে নাও স্নেহ প্রেম যতো
ফিরে এসো পূর্ব মেঘ, বোলো না কখনো তাকে
এ যুবক ময়ূরের র্হদয়ে পেখম রাঙা বরিষণ!
(মেঘদূত কথা/শাদা অন্ধকার)

____________________________
[ লেখকের নোটঃ এই মুক্তগদ্যে উদ্ধৃত কবিতাংশগুচ্ছ কবি জিললুর রহমানের দুইটি কবিতাবই যথাক্রমে ‘অন্য মন্ত্র’ (১৯৯৫) ও ‘শাদা অন্ধকার’ (২০১০) থেকে নেয়া হয়েছে। ]


0 comments: