শুকনো নদীর বুকে আগুন জ্বালাতে চেয়েছিল যে ছেলেটা


সুনীলের সাথে পরিচয়ের সময়টা ঠিক মনে পড়ছে না এই মুহূর্তে- কখন কোথায় কীভাবে তার সাথে পরিচিত হলাম অথবা কে-ই বা তার সাথে পরিচয় করিয়ে দিল কিছুই মনে নেই। শুধু মনে আছে সুনীলকে। কুড়ি-পঁচিশ বয়স, মুখচোরা। যেঁচে কারো সাথে কথা বলে না। কেউ পরিচিত হতে চাইলে তবেই; কথা বলে আন্তরিকভাবে। তবে যাদের সাথে ভাব জমে যায় একবার, তাদের সাথে সারাদিন আড্ডা আর প্রাণখোলা আলাপ। আমার সাথেও কীভাবে জানি বেশ ভাব হয়ে গেল। এবং একটা সময়ে আমার ধারণামতে অন্যদের থেকে ওর সাথে আমার সম্পর্কটাই ছিল সবচেয়ে হৃদ্যতাপূর্ণ। আমি অবাক হয়ে যেতাম ওর কল্পনাশক্তি দেখে। আবার সমানভাবে অবাক হতাম ওর জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা দেখে! এ বিষয়ে যতোবারই ওর কাছে জানতে চেয়েছি ততবারই একটা কথা বলেছে, Imazination is more important than knowledge. ও এটা মনেপ্রাণে মানতো। বলতো, এখনতো জ্ঞান বলতে তথ্য বোঝানো হয়। যে মানুষ যতো বেশী তথ্য মনে রাখতে পারে সে এখন ততো বেশী জ্ঞানী। সেই হিসেবে মানুষের থেকে একটা কম্পিউটার তো অনেক বেশী জ্ঞানী! আমি ওই জ্ঞানী হতে চাইনা দাদা। আমি ফুলের গন্ধ নিতে চাই, পিঁপড়েদের ভাত খাওয়া দেখতে চাই, প্রকৃতি থেকে আনন্দ নিতে চাই।

সুনীল বাম রাজনীতি করত। মানুষকে স্বপ্ন দ্যাখাতো সুখী-সমৃদ্ধ জীবনের। প্রচুর পড়ত সে। তর্কও করত প্রচুর। আর বলত, যে তর্ক করে না সে দাস! অনেকে বাঁকা চোখে দেখত, আবার অনেকে খুব বেশী ভালোবাসত- আদর করত। সুনীলের স্বভাবের সাথে মিথ্যা বলাটা কোনভাবেই যেন যায় না। কখনো তাকে মিথ্যা বলতে শুনিনি। যদি কখনো কোন বিষয়কে ভুল মনে হয়েছে তাহলে কোনকিছুর পরোয়া না করেই বলে ফেলেছে এটা ভুল। ও মানত যে, সত্য দিয়েই এগিয়ে যাওয়া যায়, মিথ্যা দিয়ে যায়না বরং পিছিয়ে পড়তে হয়। আর তাই উদ্যত রাইফেলের সামনে দাঁড়িয়ে অকপটে সত্য বলার অভ্যেসটা করে ফেলেছিল বেশ চমৎকারভাবে।

ছবিঃ রাজীব দত্ত

সুনীল ছিল খুব ভ্রমনপ্রিয়। কোথাও যাবার কথা শুনলেই ওর মন চনমনিয়ে উঠত। আমি আর ও অনেক জায়গা ঘুরেছি। একবার গিয়েছিলাম চট্টগ্রাম। সেখানে উঁচুনিচু রাস্তা, আঁকাবাঁকা, পাহাড়ের ভেতর দিয়ে যাওয়া, ওকে আকর্ষণ করল খুব। সেবারই প্রথম ও এরকম রাস্তা দেখল। আমাদের পরিকল্পনা ছিল চট্টগ্রামে দিন দু’য়েক থেকে তারপর কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা দেব। কিন্তু চট্টগ্রাম সুনীলকে এমনভাবে আকর্ষণ করল যে একে একে সতের দিন থাকতে হল। ওতো আরো থাকতে চেয়েছিল। কিন্তু ওর পক্ষে সেটা সম্ভব হলেও আমার সম্ভব ছিল না কারণ ততদিনে আমার ছুটি শেষ হয়ে এসেছে। তাই ওর ব্যাপক অনিচ্ছাসত্ত্বেও আমার চাকুরী রক্ষার্থে ফিরে আসতে হয়েছিল। তবে আসার আগে ওকে কথা দিতে হয়েছিল পরবর্তীতে আরো বেশিদিনের ছুটি নিয়ে আমরা আবারো এখানে ঘুরতে আসবো। যদিও এই কথা আর রাখা হয়ে ওঠেনি! এই হল সুনীল। কোথাও ঘুরতে গেলে আর ফিরে আসতে চায় না। ও বোধহয় ইচ্ছে করেই কোন পিছুটান তৈরি হতে দেয়নি, ফিরে আসতে হবে বলে।

প্রেম-ভালোবাসা বলতে সোসাইটিতে যা প্রচলিত আছে, তাকে বরাবরই এভয়েট করেছে। তবে শেষের দিকে লোকজন, যারা তাকে চিনত, তাদের মুখে এরকম একটু কথার আওয়াজ পাওয়া যেত। যদিও তার কোন সত্যতা কেউ কখনো প্রমাণ করতে পারেনি, সবই অনুমান, এই অনুমানগুলো ভিত্তিহীন, বিজ্ঞানসম্মত নয়, অনেকটা জ্যোতিষবিদ্যার মতো, তাই আমার কাছে এগুলোর কোন গ্রহণযোগ্যতা নেই। সুনীল সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে ‘শেষের দিকে’ শব্দ ব্যবহারটা আসলে কতটুকু সঠিক হল বুঝতে পারছি না কেননা এটা মৃত মানুষদের সম্পর্কেই বেশি মানায়। সুনীলতো মরেনি! যদিও ও এখন কোথায় আছে কী করছে তা আমরা কেউ জানিনা। কিন্তু তাই বলে এটা তো ধরে নিতে পারিনা যে, ছেলেটা মনে গেছে! ওতো এটাই চেয়েছিল, সবকিছু ঠিকঠাক চলবে আর ও হুট করে কোথাও লাপাত্তা হয়ে যাবে কাউকে কিছু না বলে। কেউ জানবে না সুনীল কোথায় আছে। অথচ সুনীল থাকবে; শুকনো নদীর বুকে আগুন জ্বালানোর চেষ্টায় ব্যস্ত।



৭টি মন্তব্য:

  1. পুরা গল্প টা পড়লাম অনেক ভাল লাগল - Visit our Website

    উত্তর দিনমুছুন
  2. ভালো লাগলো। কষ্টও হলো। হ্যাঁ সুনীল আছে। থাকবে। কোথাও না কোথাও

    উত্তর দিনমুছুন