‘বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা’ নিয়ে 'ঢাকা রিভিউ' পত্রিকার সাথে কথোপকথন


ঢাকা রিভিউ : এটা আপনার কততম বই। এর আগের বইয়ের নাম কি?

সাম্য রাইয়ান :
‘বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা’ আমার প্রথম কবিতার বই। প্রচ্ছদ করেছেন কবি রাজীব দত্ত। প্রকাশ করেছেন কবি রাশেদুন্নবী সবুজ। গত একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছিল আমার প্রথম বই ‘সুবিমল মিশ্র প্রসঙ্গে কতিপয় নোট’ (গদ্য)। দুটি বইয়েরই প্রকাশক পণ্যমুখি শিল্পের বিপরীত উদ্যোগ ‘বাঙ্ময়’।

ঢা রি : ‘বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা’ বইয়ে কয়টি কবিতা আছে? কতদিনের প্রস্তুতি?

সা রা :
মোট কবিতাসংখ্যা তিরিশ। এর মধ্যে এগারো খণ্ডে একটি সিরিজ কবিতা আছে।

২০১০ থেকেই ভাবছিলাম বই প্রকাশ করবো। কিন্তু যখনই পাণ্ডুলিপি গোছাতে শুরু করেছি, ফলাফলে দশটি কবিতাও হাতে উঠে আসে নি।

লেখালিখির শুরু থেকে ২০১২ পর্যন্ত আমি যতো কবিতা লিখেছি, তার মধ্যে শুধু পাঁচটি কবিতা রেখে বাকী সবই ফেলে দিয়েছি। এই পাঁচটি কবিতাই এ বইয়ে থাকছে। এ ছাড়া বাকী কবিতাগুলো ২০১৪-’১৫ এই দু’বছরে লিখিত।

ঢা রি : আমাদের বই শুধু মেলা উপলক্ষে বের হয় কেন? এটা কি ঠিক?

সা রা :
এ বিষয়ে একটি কথা আমি সবসময়ই বলি। বাঙলাদেশে পাঠকদের কাছে বই পৌঁছানোর সবচেয়ে বড় মাধ্যম একুশে বইমেলা। ফলে বই বিক্রির জন্য লেখক-প্রকাশকদের তাকিয়ে থাকতে হয় বইমেলার দিকে। আমার মনে হয় বিপনন সমস্যাই এর প্রধান কারণ। যেহেতু এদেশে এখন পর্যন্ত প্রয়োজনীয় বিপনন ব্যবস্থা গড়ে ওঠে নি, ফলে প্রকৃত বিচারে ক্ষতিকর এই প্রবণতাটির প্রতিকার আমরা করতে পারছি না!

যেমন মফস্বলকেন্দ্রিক সাহিত্যপত্রিকাগুলো দেখবেন অধিকাংশই প্রকাশিত হয় অনুষ্ঠানকেন্দ্রিক; যেমন একুশে ফেব্রুয়ারি, ছাব্বিশ মার্চ, পহেলা বৈশাখ, ষোলই ডিসেম্বর প্রভৃতি। এর পেছনে অঘোষিত প্রধান কারণও বিপনন। এই বিশেষ দিবসকেন্দ্রিক পত্রিকা প্রকাশ করলে বিপনন সহজ হয়; কেননা দিবসভিত্তিক অনুষ্ঠান এদেশে প্রতিটি জেলায়ই হয়; আর সেই অনুষ্ঠানে ঐ অঞ্চলের সংস্কৃতিকর্মীদের মোটামুটি একটা অংশ উপস্থিত থাকেন। আমাদের একুশে বইমেলার অবস্থাও হয়েছে তেমনই। প্রকাশক সারাবছর বই প্রকাশ করে সেই বই কী করবেন? কোথায় বেচবেন? সারাদেশে বইয়ের দোকান আছে? নেই তো। অবিকশিত পুঁজিবাদি এই রাষ্ট্রে প্রকাশনা শিল্পটা দাাঁড়াতেই তো পারল না! (অবশ্য কোনো শিল্পই আদতে দাঁড়ায় নি বলেই আমার ব্যক্তিগত অভিমত।) এইসব বিষয়ে রাষ্ট্রীয় বৃহৎ উদ্যোগের প্রয়োজন থাকলেও এই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের এ বিষয়ে যথার্থ আগ্রহ নেই। যতোটুকু সামান্য লোক দেখানো উদ্যোগ আছে তা দুর্নীতি/লুটপাট করে বানরের পিঠাভাগের মতো করে শেষে যেটুকু অর্থনৈতিক বরাদ্দ থাকে তা দিয়ে দলীয় কর্মী/সমর্থদের বই ক্রয়/সংরক্ষণ অথবা এরকম কাজে লাগানো হয়। ফলে বই প্রকাশকদের তাকিয়ে থাকতে হয় বইক্রেতা সেইসকল পাঠকের দিকে, যাঁরা একুশে বইমেলায় আসেন দেশের বিভিন্ন থেকে বই কেনার জন্য।


ঢা রি : একটা বইয়ের থিম কিন্তু তার শিরোনাম।আপনার শিরোনাম কিভাবে দেওয়া।

সা রা :
বইটার নাম অনেক আগে ঠিক করেছিলাম। এবছর জানুয়ারিতে মনে হয়েছিল নামটি পরিবর্তন করে নতুন নাম দিই, মহাকোলাহল। পরে নতুন নামটি ধোপে টিকল না; আগের নামটিই পুনঃবহাল হল। বইটি শুরু হয়েছে মহাকোলাহল দিয়ে। এই পাণ্ডুলিপি আমি যেভাবে গুছিয়েছি, তাতে এই নামটি ছাড়া অন্য কোনো নাম আমার মাথায় আসেনি। কিন্তু এই বইয়ের কবিতাগুলোকে কোনো এক নামে ধরা সম্ভব নয়। এমন একটি নাম দিতে চেয়েছি যাতে পাঠক ভেতরের উপাদান সম্পর্কে যথাসম্ভব আভাস পায়। একটা তথ্য দিই, নামকবিতাটি সূচিপত্রে নেই, এটি বড় অক্ষরে ষষ্ঠ পৃষ্ঠায় মুদ্রিত আছে শিরোনামহীনভাবে।

ঢা রি : এই কবিতাগুলো কি অটোমেটিক পোয়েট্রি না আপনি সচেতনভাবে কোনো থিম নিয়ে কাজ করেছেন?

সা রা :
কবিতা লেখা ব্যাপারটা আমার কাছে সাধনা। অলৌকিক/স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রথম পংক্তি কেন, একটা সেমিক্লোনও আমার মস্কিষ্কে প্রবেশ করে না। আমি যা লিখি, যতোটুকু লিখি, তার সবটাই আমার চর্চার ফল; সাধনার ফসল।

এক দিনের চব্বিশ ঘন্টাই আমি চিন্তা করি; ভাবি। সেই ভাবনাগুলোই লিখি; এভাবে, লিখতে লিখতে যাচ্ছি..

ঢা রি : কবিতার কি কোনো দায় আছে? থাকলে সেই দায়বোধ কি আপনার বইয়ে আছে?

সা রা :
কবিতার দায় কবির আত্মর কাছে। কবি সেখানে মিথ্যা বলতে পারেন না; শঠতা, কপটতা, ভণ্ডামী, জোচ্চুরী করতে পারে না। প্রকৃত কবিতা লেখার সময় কবি এক ভিন্ন মানুষ; মানুষের সর্বোচ্চ স্তরে বসে তিনি নৈর্ব্যক্তিকভাবে পৃথিবী দ্যাখেন; যেখানে কবি ব্যক্তিটিও একটি চরিত্র হয়ে ঘোরাফেরা করতে থাকে। কবিতা লেখকটি তখন সকল মানবগুণাবলীর সমন্বিত শ্রেষ্ঠ রূপ। ফলে এমনও হয়, প্রকৃত কবিতা ঐ রচনাকারী ব্যক্তিরই বিপক্ষে দাঁড়ায়, যদি রচনাকারীও ভণ্ডামী করে। দুইটি উদাহরণ চোখের সামনেই আছে; দেখুন, দুইটি কবিতাংশ কীভাবে রচনাকারীর বিপক্ষে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদী ভুমিকা পালন করছেঃ

“প্রতারণার পায়ের চাপে পিষে যায় সত্যের সবুজ সব শস্য,
বিষ্ঠা আর কেরোসিন গিলে খায় নদীর স্বচ্ছতা।”
-সৈয়দ শামসুল হক

“তোমার হৃদয় থেকে তুমি খসে পড় ভিন্ন ভিন্ন ভাবে, ভিন্ন ভিন্ন দিনে
আমার জানা ছিল না, আমার জানা ছিল না, আমার জানা ছিল না।”
-ফরহাদ মজহার

ঢা রি : আপনার এই কবিতার বই পাঠককে কি বলতে চায়?

সা রা :
পুরো বই, যাতে ত্রিশখানা কবিতা আছে; ১৯৭৭ টি শব্দ আছে; সেই বই কী বলতে চায়, পুরো বইয়ের কী বক্তব্য তা যদি এক প্রশ্নের উত্তরে বলতে পারতাম, তাহলে এতোগুলো শব্দ খরচ করতাম না।

ঢা রি : কবিতার বই চলে না জাতীয় একটা কথা প্রচলিত আছে। এটা কি ষড়যন্ত্র?না চললে এত বই বের হবে কেন?

সা রা :
ভাষাবিজ্ঞানের সর্বোচ্চ স্তর কবিতা। এ দেশে কতোজন মানুষ বাঙলা ভাষা শুদ্ধভাবে পড়তে, লিখতে ও বলতে পারে? পুরো বাঙলাদেশ মিলে সম্ভবত সংখ্যাটি দুইশ’ হতে পারে। তাহলে কবিতার বই কীভাবে প্রচুর বিক্রি হবে?

এটা বললাম তত্ত্বীয় দিক থেকে। বাস্তবতা হলো, এদেশে পর্ণ বই, ডিকশনারী, পকেটসাইজ সংবিধান/আইন সহায়িকা, বাচ্চাদের ছড়ার বই আর হুমায়ুন আহমেদ ছাড়া কোনো আউটবইই হাজার কপি বিক্রি হয় না।

প্রতিবছর আমার দ্যাখা বাস্তবতা অনুযায়ী প্রকৃত কবিতার বই দশটির বেশি প্রকাশিতই হয় না।

ঢা রি : আপনার এই বইয়ের কতটুকু প্রচারণা ও বিক্রয় আশা করেন?

সা রা :
আমি জানি আমার বই হু হু করে বিক্রি হবে না; হয়তো সামান্য কিছু কপি বন্ধুরা-সুহৃদগণ কিনবেন; দুই-তিনজন অপরিচিতও কিনতে পারে বইমেলা থেকে –এ পর্যন্তই। থাকি বাঙলাদেশের শেষ প্রান্ত কুড়িগ্রামে; মিডিয়াঅলা বা ঐ রকম লোকজনের সাথে যোগাযোগ/বন্ধুতা নেই বললেই চলে, যারা নিজে থেকে প্রচারণায় সহযোগীতা করবেন। যোগাযোগ তৈরিতেও আগ্রহ নেই। একজন কবির পক্ষে কবিতার সাধনা করা, বই প্রকাশ, বিক্রি এবং তার সাথে প্রচারণা করা তো আর খুব একটা সম্ভব নয়। আমাকে সবকিছুই করতে হয়। সাধনা ছাড়া বাকী সবই তো সাংগঠনিক কাজ। আমি মনে করি সাধনা ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড দুটো একসাথে পূর্ণভাবে  করা সম্ভব না। একটি পরিপূর্ণ হলে অপরটিতে ঘাটতি পড়বেই। আমি সাধনা পরিপূর্ণভাবে করতে চাই। আর এদেশে প্রকৃত সমালোচনার ধারাও তো এখনো গড়ে উঠে নি। সমালোচনার নামে যা হয়, তা আসলে বন্ধুকৃত্য ছাড়া আর কিছুই নয়। আমার যেহেতু ওরকম বন্ধু নেই, ফলে কৃত্যও নেই। আমার বই নিয়ে কোথাও কোনো আলোচনা, প্রচারণা, কিছু হবে না জেনেই বইটি প্রকাশ করেছি।

ঢা রি : আপনার পাঠকের জন্য কিছু বলবেন?

সা রা :
আমার পাঠককে যা বলার, তা কবিতায় বলেছি। কবিতার বাইরে তাদের প্রতি কিছু বলার নেই। তবে কিছু মানুষের কথা আমাকে বলতেই হবে। কিছু মানুষ, যেমন এই বইটা আমি যাকে উৎসর্গ করেছি সেই রাশেদুন্নবী সবুজ, যদি এঁর সাথে আমার পরিচয় না হতো; আমার শিক্ষকের ভুমিকা পালন না করতো তাহলে আমি আজ এভাবে লেখালিখিসহ অন্যান্য প্রগতিশীল কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত হতে পারতাম না। বইয়ে চারজন মানুষের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছি; তাথৈ, বৃতি হক, কবি ভাগ্যধন বড়ুয়া, কবি কুশল ইসতিয়াক; এঁরা না থাকলে সত্যি কথা আমি বই প্রকাশ করতে পরতাম না। কবি ফরহাদ নাইয়া মেলায় বিপননের দায়িত্ব নিয়ে আমার বড় উপকার করেছে। এঁরা আমাকে অনেক ভালোবাসে বলে বিভিন্নভাবে সহযোগীতা করেছে; করছে। আসলে ভেতরে ভেতরে বইটা এরাই প্রকাশ করেছে; আমি শুধু সমন্বয় করেছি মাত্র। এঁদের কাছে আমার অপরিশোধ্য ঋণ।

ঢা রি : বাংলা একাডেমির মেলা ও অন্য কোথায় বইটি পাওয়া যাবে?

সা রা :
বইমেলায় লিটলম্যাগাজিন চত্ত্বরে চালচিত্র, জঙশনের স্টলে পাওয়া যেতে পারে। তবে বইমেলা শেষে ঢাকায় সংহতি বইয়ের ঘর (কাঁটাবন), রংপুরে প্রমিতি, চট্টগ্রামে নন্দন, বিস্তারে পাওয়া যাবে।

0 comments: