টোলখাওয়া চেহারায় আঁধারে দাঁড়িয়ে লাভ নেই


নরক হতে উত্তীর্ণ বোধগুলো দু’হাতে জড়িয়ে শূন্যে ছেড়ে দিলে সব ভাসতে থাকে চলনবিল পেরিয়ে রাজধানীমুখী; একটার পর একটা বিকেল, একটার পর একটা সন্ধ্যা আর রাত।
একটার পর একটা নদী লিখে যাচ্ছি,
মার্কার পেন দিয়ে আন্ডারলাইন করে রাখতে হচ্ছে ঘন ঝোপঝাড়গুলোকে।
সবচেয়ে শান্ত হরিণের দিকে দৃষ্টির চাকু ছাল ছাড়াচ্ছে বারবিকিউর তৃষ্ণা।
আর খুলে পড়ে যাচ্ছে আফ্রিকান হাতির দাঁত।
শক্ত জিপের চাকা কড়কড় করে উঠে আসছে কচি পায়ের উপর।
এন্টেনা দিয়ে বাঘদের ঘিরে রাখছে ডিসকোভারি চ্যানেল।
প্রাণীগুলি বড়ই লাজুক যখন তাদের সার্কাসে দেয়া হয়।
ওদের মাতৃকালীন স্রাব হাসি ছড়াচ্ছে রানওয়ের গেটে,
সেখানে একদল বয়স্ক নর্তকী নিজেদের বুকের উপর বন্দুক ধরে আছে
(লিখতে লিখতে যাচ্ছি । পদ্ম)
 
১.২
এইসব বিচ্ছিরি বোধের দেশে নিজের ভেতরে নিজেই গুটিয়ে থাকে নিঃসঙ্গ আকাশ। আর জীবন এতোটাই প্রাণহীন যে, টোকখাওয়া চেহারায় আঁধারে দাড়িয়ে লাভ নেই।

নিজের ভেতরে নিজেই লুকিয়ে থাকবার চেষ্টা করতাম একসময়
কেউ দেখে ফেলতে পারে ভেবে হৃৎপিন্ডটা সরিয়ে রাখতাম দূরে

আলোকিত পৃথিবীতে মুখ লুকানোর জায়গার খুব অভাব চলছে এখন
(পৃথিবী, পৃথিবী এবং নার্সিসাস । সাম্য রাইয়ান)
 

চকচকে ব্লেড দিয়ে অনবরত কাটছিলো সে স্মৃতির পাউরুটি। প্রচন্ড ক্ষুধায় তাকাচ্ছিলোনা এদিকে-সেদিকে, কোনোদিকেই; একমনে কাটছে তো কাটছেই। ওদিকে আরেক দৃষ্টান্ত; ব্লেড দিয়ে জলকাটার মতো করে চলছে ভূমিভাগপ্রক্রিয়া।



পূর্বের জীবন এখন কেবলই স্মৃতি। সেইসব সন্ধ্যা, বিকেল, রাত আর ঐসব গল্পশোনাকাল। সেইসব বৃক্ষ, নদী, বাড়ি, বুড়ি, শিশুর গল্প বলার কেউ নাই আর। শুধু জেগে আছি আমি স্মৃতির শলাকা পুড়িয়ে। হৃৎপিণ্ড এক জ্বলন্ত গোলক।

তুমি আর শুধু সন্ধ্যা নও-
স্মৃতির আধার:
ওই যে পাখিটি ডাকলো সাঁঝের শেষ ডাক;
ওই যে দূরে কোথায় কী একটা শব্দ হঠাৎ;
শাঁখ বাজছে, উলুধ্বনি, শিশু কাঁদে;
এই যে ঘরেতে কত কালের মাকড়সারা,
কলমদানির গায়ে ধুলো, ফুরোনো কলম...

শেষ হলো তবে?
আঁধারের প্রতিটি ভিতরে এখন যাত্রা গহীন:
আকাশ সারাটা জুড়ে উঠছে ফুটে মোহন মিথ্যা
ক্লেদ পাপ মিথ্যাচার ছলা ও ছলনা
ক্লান্তশ্বাস দ্রুতম্বাস কত দীর্ঘ নিঃশ্বাস
অশ্রু আর রক্ত আর ঘ্রাণ ও লবন

আরও কত অজানা নক্ষত্র...

তারপর
আগুন জ্বালার ঠিক পূর্বক্ষণে ভেবে নিতে দিও
সব স্মৃতি ভাবা হল কি না-!
(স্মৃতি । অনুপ চণ্ডাল)
 

এইখান হতে যতোগুলো শব্দ শোনা যায়, তার সবগুলো কিছুটা সময় নিয়ে, মিশ্রিত, একটি গর্জন হয়ে হাজির হবে। আর দূর হতে ভেসে আসা শত-সহস্র কন্ঠস্বর কুলধ্বনির মতোই মিশে যাবে একটি বিন্দুতে। আর সেই বিন্দুগুলো, অগণিত, জড়ো হতে হতে তৈরি হবে আরেকটি বিন্দু। এর ভেতর দিয়ে তুমি বারো মাস কেবল ভেরেণ্ডা ভেজে খাও, নয় বৌয়ের পুতুলনাচ দেখো, মরার উপর খাঁড়ার ঘা দেখো, কোথাওবা উটের পিঠে স্বচ্ছ জলকণা জন্ম নিতে দেখো। তারপরেও জেনো, তবু অনেক কিছুই জানবার তাকে বাকি।

অভ্যেসে মিলাও বিন্দু, তার মাঝে ভাবো বহুদূর, তার মাঝে
সব দায়দেনা শোধবোধ করো, তারপর ঘুমাও ছ’মাস,
বিন্দুবিসর্গের খোঁজ আর তখন থাকে না, বাকি বারো মাস
কেবল ভেরেণ্ডা ভেজে খাও, নয় বৌয়ের পুতুলনাচ দেখো,
মরার উপর খাঁড়ার ঘা দেখো, কোথাও উটের পিঠে স্বচ্ছ
জলকণা জন্ম নিতে দেখো, তথাপি অনেক কিছু জানবার
থাকে বাকি, ওইটুকু বিন্দুর সমান তবু এখনও অনেক
কিছু তুমি জানতে পারো না, তাই খেদে কিচেন-নাইফ দিয়ে
অন্নচিন্তা কুচি কুচি করো, কেটে-ছিঁড়ে দেখো সব সম্ভাবনা,
পান করো সমস্ত নির্যাস, মদ ও কৌমার্য, তার মাঝে চলে
আরও কিছু কাল, ফের শুরু হয় আরও সুক্ষ জল্পনাা-কল্পনা,
বিন্দু বিন্দু ভাব জমে, ভাব থেকে জন্মায় কথা সারিৎসাগর,
তার অর্থে টের পাও নিয়তির খেল, আক্ষেপে আটকে যায়
সব, তাতে তুমি খুদে বিন্দু হয়ে যাও, ধরো, ক্ষুদ্রতম কেউ,
যেন অণুপ্রমাণিত, না কি ফের নরকে বিছানা নেবে তুমি,
সারাক্ষণ তাকবে সবার কুনজরে, তার চেয়ে হও দেবদারুগত,
(বিন্দুবিসর্গের খোঁজে । শান্তনু চৌধুরী)

[ নিখিল নওশাদ সম্পাদিত 'বিরোধ', প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত ]

1 টি মন্তব্য:

  1. “আলোকিত পৃথিবীতে” না পড়ে, আমার আলোর পৃথিবীতে পড়তেই ভালো লাগছে। এবং ওই কবিতাতেই “যে” শব্দটা না থাকলে কেমন হয় ভেবে দেখবেন। একই অনুভূতি প্রকাশের জন্য পরের স্তবকে বোধয় জায়গায় আছে।

    উত্তর দিনমুছুন