মিডিয়া কি ক্ষমতাবানদের ল্যাপডগ?


আজকের সময়ে মানুষের মনোজগত নিয়ন্ত্রণ করে মিডিয়া, মানুষকে প্রভাবিত করে মিডিয়া; সেই মিডিয়া টাকাঅলার মিডিয়া; আর গণমানুষের মিডিয়া গণমানুষ পর্যন্ত পৌঁছতেই পারছে না।

আজকের দিনে আমরা কোন কাপড় গায়ে চড়াব, কোন জলে-কীভাবে হাত ধোব, কয়বেলা ভাত খাবো, কতোবার-কীভাবে-কোন বস্তু ব্যবহার করব- তা নির্ধারণ করে দেয় বুর্জোয়া মিডিয়া; আজকের ঈশ্বর। আমাদের আর ভাবতে হচ্ছে না, চোখ খুললেই দেখছি চোখের সামনে লম্বা লাইন- শ্রেষ্ঠত্বের বড়াই। এক কথা এক রেট, দিন-রাত, অফ-পিক, বদলে দিন, কথার দেশে কথা বলবেন নাতো কী করবেন, তরুণরাতো একটু প্রতিবাদীই, দিন-রাত কথা আর কথা, আমার ‘সেবা’ নিন, ওরটা পঁচা, ওর মাল কিনবেন না- ভেজাল আছে, এই মহাবিশ্বে আমিই প্রথম- আমিই সেরা...; আরো কতো কী! এইসব বালছাল শুনতে শুনতে, দেখতে-দেখতে অন্ধ হবার জোগার। মাঝে মাঝে মন চায় আলোটা নিভিয়ে একটু ঘুমাই, জুড়াই। উপায় নেই। দুনিয়াজোড়া এতো আলো, চোখ খোলা যাচ্ছে না; এটা একটা মস্ত পরিকল্পনা। অন্ধকার জগতকে আলোকিত করবার লোভ দেখিয়ে সাম্রাজ্যবাদী প্রতিষ্ঠান এবং তার এদেশীয় দালালরা এতো আলো ছড়িয়েছে; অন্ধকারে আমরা যা দেখতে পেতাম, এখন তার সিকিভাগও পাই না; বদলে গেছে! দূরত্ব তৈরি হচ্ছে; ক্রমাগত; হচ্ছে তো হচ্ছেই!

২.
আক্রমণটা শারীরিক নয়, মনস্তাত্ত্বিক। আমাদের মনোজগতকে পুরোপুরি দখল করে নিয়ন্ত্রণের লাগি ওরা প্রচন্ডরকম সচেষ্ট। দেশি-বিদেশি মিডিয়াকে তারা এক্ষেত্রে সাবলীল ব্যবহার করছে, সফল অস্ত্র হিসেবে। ওরা যেভাবে চাচ্ছে দৃশ্য সেভাবে তৈরি হচ্ছে; ওরা যেভাবে চাচ্ছে টেক্সট সেভাবে তৈরি হচ্ছে। সেই দৃশ্য/টেক্সট ঐ প্রচারমাধ্যম মারফত জনগণের মধ্যে পৌঁছচ্ছে, তাদের বিশেষ-ব্যাপক প্রচার-কৌশলের ফলে জনগণের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করে বিশাল জনগোষ্ঠীকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হচ্ছে। এরকম সম্মোহিত অবস্থায় জনগণ বাধ্য হচ্ছে ওদের পক্ষাবলম্বনে...


৩.
সকল প্রকার তথ্যপ্রাপ্তিকে জনগণের ‘অধিকার’ বলে বেশ একটা প্রচারণা চলছে অনেকদিন। প্রচারণাটা বেশ জমে উঠেছে, বিশেষত মফস্বলগুলোতে; বিভিন্ন এনজিও, এনজিও টাইপের সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং প্রচুর বোকাচোদা-ক্যারিয়ারের নেশাগ্রস্ত তরুণ ও সংস্কৃতিজীবীদের কল্যাণে।

আমরাতো জানি জাতীয় সম্পদ বিদেশে পাচারের ষড়যন্ত্রমূলক চুক্তির তথ্য গোপন রাখা হয়, মিডিয়াঅলারাও ঐসব বিষয়ে চুপটি মেরে এমনভাবে সংবাদ পরিবেশন করে যেন কিছুই হয়নি। জাতীয় সম্পদ, জাতির ভবিষ্যতের প্রশ্নে অবাধ তথ্যপ্রবাহের বুলি তারা প্রচার করে না।

জনগনের পক্ষের যে দু-একটি মিডিয়া এইসব বিষয়ে কথা বলে তাদের মুখ বন্ধ করার জন্যই ‘সম্প্রচার নীতিমালা আইন ২০১১’ প্রস্তাব করা হয়। যেখানে এতো নোংরাভাবে ফ্যাসিবাদী কায়দায় মিডিয়ার কন্ঠরোধ করার প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে যার বাস্তবায়ন হল শুধুমাত্র নাচ-গান প্রচারণাই মিডিয়ার কাজ; যা করে থাকে স্টার গ্রুপের চ্যানেলগুলো (স্টার জলসা, স্টার প্ল­াস প্রভৃতি)। আর এই গ্রুপটিই বর্তমানে বাংলাদেশে মিডিয়াজগতে আইডলের ভুমিকা পালন করছে। শোষকশ্রেনি যখন দেখল প্রিন্ট মিডিয়া তা-ও নিয়ন্ত্রণে রাখা গেছে- কিন্তু অনলাইন মিডিয়া মুক্ত মিডিয়া হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে- অবাধ তথ্যপ্রবাহ সৃষ্টি করছে- তখন তাদের প্রয়োজন পড়ল এরও কন্ঠরোধ করার। আর তাই প্রস্তাব করা হল ‘সম্প্রচার নীতিমালা-২০১১’ এর মতো আরেকটি ফ্যাসিবাদী নীতিমালা ‘অনলাইন গণমাধ্যম পরিচালনা নীতিমালা-২০১২’। যার শুরুতে তারা নিজেরাই সত্য কথাটা স্বীকার করেছে এইভাবে: ‘বিশ্বায়নের এই যুগে অনলাইভিত্তিক সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও বেতার শক্তিশালী ও কার্যকর প্রচারমাধ্যম। প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নয়নের ফলে মানুষের বাক ও ভাব প্রকাশের এই মাধ্যম অতি দ্রুততার সাথে বিশ্বব্যাপি প্রচার লাভ করেছে। প্রচলিত সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও বেতারের বিভিন্ন চ্যানেলের পাশাপাশি ওয়েব বা ইন্টারনেটের মাধ্যমেও অনলাইন সংবাদ ও অনুষ্ঠানের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। যা সম্প্রচার, প্রকাশনা, প্রদর্শন ও পরিচালনায় কোন বিধি বিধান বিদ্যমান নাই এবং এ সম্পর্কিত একটি নীতিমালা প্রনয়ন করা জরুরী।’

তারা বলছে অনলাইন গণমাধ্যম সম্প্রচার, প্রকাশনা, প্রদর্শন ও পরিচালনায় কোন বিধি নিষেধ নাই; কিন্তু এই বিধি নিষেধ আরোপ জরুরী। কিন্তু কেন? কারণ তারা বুঝতে পেরেছে এখনই যদি এর কন্ঠরোধ না করা হয়, তবে আরো পরিণত হলে এর শক্ত ভিত্তি তৈরি হবে।


রাষ্ট্র সকল মিডিয়াকেই বিটিভির মতো প্রতিবন্ধী মিডিয়া হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।


এরকম নানা উপায়ে তারা জনগণকে জ্ঞান ও তথ্য প্রাপ্তি থেকে বিরত রাখতে চাইছে। আবার অপরদিকে অবাধ তথ্যপ্রবাহের ধোয়া তুলছে। তবে তারা যে সকল তথ্যকেই গোপন করছে, তা নয়। অনেক তথ্যকেই তারা বেশ ফলাও করে, এমনকি বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছে। এখন দেখা দরকার তথ্য বলতে তারা কোন তথ্যকে বোঝাচ্ছে। রাষ্ট্র আপনার কাছে টিকাদান বিষয়ক তথ্য (কবে, কোথায়, কীভাবে ইত্যাদি), ভোটদেয়া বিষয়ক তথ্য (কবে, কোথায়, কীভাবে ইত্যাদি), শিক্ষা বিষয়ক তথ্য (কোথায় পড়লে কতো টাকা, কীভাবে ভর্তির ‘সুযোগ’ পাবেন, নতুন মূল্যতালিকা ইত্যাদি) কিংবা এইরকম সহ-মৌলিক তথ্য সরবরাহ করে। এনজিও আপনার কাছে ঋণ বিষয়ক তথ্য, নতুন ‘সেবা’ (আসলে হবে ফাঁদ) বিষয়ক তথ্য এবং তার সাথে রাষ্ট্র পরিবেশিত তথ্যসমূহকেই প্রচার করে ‘অবাধ তথ্যপ্রবাহ’ বজায় রাখে। এইভাবে টেলিকম কোম্পানী দিচ্ছে নতুন কলরেট ‘তথ্য’, বিশেষ ছাড়/অফার ‘তথ্য’; মিডিয়া দিচ্ছে নাচ-গানের সময়সূচি ‘তথ্য’, পণ্যমূল্য ‘তথ্য’ সহ এইরকম অ-মৌলিক তথ্য।

তথ্যসন্ত্রাস এতো বেড়ে গেছে যে উন্মাদ হবার জোগাড়। সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসনকৌশল পাল্টে যাচ্ছে নিয়ত। দ্বিতীয় বিশ্ব থেকে একজন প্রভুভক্ত কুত্তা নির্বাচন করে তাকে তাবিজ পড়িয়ে, হাইলাইট করে দ্বিতীয় বিশ্বের নেতা বানানো হচ্ছে। এবং পরবর্তীতে সেই প্রভুভক্ত কুত্তা দেশে ফিরে প্রভুর নামজপ করতে করতে জনগণের দিকে ছুটে যাচ্ছে কামড়াতে। দ্বিতীয় বিশ্বের দেশগুলোর জন্য এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ ড. মোহাম্মদ ইউনুস। নোবেলের শক্তি হৃদয়ে ধারণ করে তিনি চট্টগ্রামের বুকে পা দিয়ে যে উদ্ধত মন্তব্য করেছিলেন, তা সকলেরই জানা। (এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পড়ুন বদরুদ্দীন উমরের ‘ডক্টর ইউনুসের দারিদ্র্য বাণিজ্য’)

এসব নিয়ে মাথাব্যথা নেই মিডিয়াগুলোর। কারণ, মিডিয়াজগতের মালিক শোষকশ্রেণি। আর যে দু-একটা জনগণের পক্ষের মিডিয়া, তাদের জন্য রয়েছে ‘গণমাধ্যম পরিচালনা নীতিমালা’ নামক কন্ঠরোধকযন্ত্র।

সুদখোর ইউনুসের মতো একজন দেশধ্বংসের কারিগরকে যখন ইস্কুলের বোর্ড বইয়ে মহামানব/নারীমুক্তির অগ্রদূত হিসেবে হাজির করা হয়, তখন আমার বক্তব্য প্রমাণের জন্য বিস্তর ব্যখ্যার প্রয়োজন হয় না।

[ মিডিয়াশাস্ত্র অধ্যয়নের নোট-১/সাম্য রাইয়ান/নভেম্বর-ডিসেম্বর ২০১২ ]

0 comments: