রানা প্লাজা প্রসঙ্গে: শ্রমিক হত্যাকান্ড কি চলতেই থাকবে?


তাজরীন ফ্যাশনসের শোক ভোলা তো দূরের কথা, রক্তের দাগ শুকাতে না শুকাতেই সামনে হাজির হল রানা প্লাজার শোক।
 
গত ২৪ এপ্রিল ঢাকাস্থ সাভারের রানা প্লাজা নামের একটি ভবন ধ্বসে শতশত শ্রমিক নিহত হয়েছেন; এবং পঙ্গু হয়েছেন কয়েক হাজার।


নির্মাণ ত্রুটির কারনে ভয়াবহ ফাটল দেখা দেয়ায় রানা প্লাজার মালিক বুর্জোয়া প্রতিক্রিয়াশীল দলের নেতা সোহেল রানা স্থানীয় প্রকৌশলী আব্দুর রাজ্জাকের সহায়তায় ভবনটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে অতিরিক্ত ঝুঁকি থাকায় শ্রমিকদের তোপের মুখে গত ২১ এপ্রিল পাঁচ দিনের জন্য ভবনটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। ভবনের প্রথম তলায় ব্রাক ব্যাংকসহ আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ছিল। আগের দিনই তারা গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র ভবন থেকে সরিয়ে নেয় এবং প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করে। ঘটনার দিন ব্যাংক কর্মীরা আর আসেননি। কিন্তু বন্ধ ঘোষণার দুই দিন যেতে না যেতেই ২৪ এপ্রিল ভবন মালিক রানা ভবনটি খুলে দেয়। এবং চাকুরীচ্যুত করার হুমকি দিয়ে জোর করে পোশাক শ্রমিকদের কাজে যোগ দিতে বাধ্য করে। আর ঐদিনই সকাল সাড়ে ৯ টার দিকে ধ্বংশন্মুখ এই ভবনটি ধ্বসে পড়ে।
 

ঐদিন শ্রমিকরা ধ্বংসোন্মুখ ঐ ভবনে প্রবেশে অস্বীকৃতি জানালে জোরপূর্বক তাদেরকে ভেতরে প্রবেশ করানো হয়। ধ্বংসস্তুপ থেকে উদ্ধার হওয়ার ১৬ ঘন্টা পর জ্ঞান ফেরা এক গার্মেন্টসকর্মী বলেন, ‘সকালে ঘুম থেইকা উঠেই কারখানা থেইকা ফোন। লাইনম্যান রানাভাই ফোন কইরা কইল, ডরের কিছু নাই। ইঞ্জিনিয়ার আইসা দেইখা গেছে। এই বিল্ডিং আরো একশ’ বছরেও কিছু হইব না’। তিনি আরো বলেন, ‘আমাগো সাথের যারা (সহকর্মী) আসতে চায় নাই অগরে মালিক লোক দিয়া ফোন করাইয়া, বেতন দিবো না বইলা ডর দেখাইয়া কাজে আনছিলো’। এইভাবে মিথ্যা কথা বলে, বেতন-ভাতার কথা বলে জোর করে কাজে যোগ দিতে বাধ্য করে সোহেল রানা।

 

মালিকশ্রেণির প্রচার মাধ্যমগুলোতে প্রচার করা হচ্ছে, এটি একটি দুর্ঘটনা। আসলে মালিকের বেপরোয়া মুনাফার আকাঙক্ষা এবং জনগণের নিরপত্তার প্রতি রাষ্ট্রের উদাসীনতাই শতশত মানুষের এ নির্মম মৃত্যুর জন্য দায়ী। সুতরাং এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়; বরং রাষ্ট্র-সরকার এবং মালিকশ্রেণি কর্তৃক সংঘটিত নৃশংস শ্রমিক হত্যাকাণ্ড।
 

এই হত্যাকাণ্ডের পর আমরা অসংখ্য শোকবার্তা পেয়েছি, সান্ত্বনাবাণী পেয়েছি, ‘দায়ী’ ব্যক্তিদের বিচারের আশ্বাস পেয়েছি। কিন্তু আমরা জানি এই ঘটনার বিচার এই রাষ্ট্র করবে না, করতে পারবে না। কারণ এই রাষ্ট্র শ্রমিকবান্ধব নয়, মালিকবান্ধব।
 

ভবন ধ্বসে শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এর আগে ৯ তলা স্টোকট্রাম গার্মেন্টস ধ্বসে পড়ে কয়েক হাজার শ্রমিক মাটিতে মিশে যান। গত বছরের ২৪ নভেম্বর আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরের তোবা গ্রুপের তাজরীন ফ্যাশনস কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে কয়েকশ’ শ্রমিক নিহত হন। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে স্মার্ট, গরীব এন্ড গরীব, হা-মীমসহ অনেক গার্মেন্টস-এ আগুনে পুড়ে অসংখ্য-অগণিত শ্রমিক কয়লা হয়ে গেছে। প্রতিটি ঘটনার পরই সরকার নিহতের প্রকৃত সংখ্যা গোপন করেছে এবং ব্যবস্থা নেবার আশ্বাসই কেবল দিয়েছে। আজ অবধি কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। এসব ঘটনার জন্য দায়ী কোনো গার্মেন্টস মালিককে আইনের আওতায় আনেনি, শাস্তির ব্যবস্থাও করেনি। এমনকি যে সামান্য ক্ষতিপূরণ শ্রমকিদের দেয়া হয়েছে তার দায়িত্বও মালিককে নিতে হয়নি। বরং মালিকশ্রেণির রাষ্ট্র হিসেবে মালিকের পক্ষ হয়ে রাষ্ট্র জনগণের অর্থ দিয়েই সেই দায় মিটিয়েছে।
 

গার্মেন্টসে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার না থাকলেও মালিকদের দুটি সংগঠন বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ রয়েছে। একেকটি বিশাল মাপের হত্যাকাণ্ডের পর এই সংগঠন দুটির কাজ হল নানান চাপাবাজি করা এবং যে কোনো উপায়ে দায়ী মালিককে রক্ষা করা।
 

গণহত্যা করেও মালিকরা রক্ষা পায়। কারণ বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ছাড়াও সরকার তাদের পক্ষে কাজ করে। মালিকশ্রেণির টাকায় ক্ষমতায় থাকার কারণে মালিকদেরই বাঁচায় সরকার, শ্রমিকদের নয়। শ্রমিকের প্রাণের মূল্য এখানে তুচ্ছ! সামান্য কিছু টাকায় এখানে হত্যার দায় শোধ করা যায়! হত্যাকারী শাস্তি পায় না। ফলে এক হত্যাকান্ডের রক্তের দাগ শুকাতে না শুকাতেই আরেক হত্যাকান্ড সৃষ্টি হয়।
 

তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকান্ডের পর দোষী মালিকের বিচার হওয়াতো দূরের কথা, বরঞ্চ তাকে টেলিভিশনে বিভিন্ন টক শো’তে এসে অগ্নিকাণ্ডের সমস্ত দায় উল্টো ওই শ্রমিকদের ওপর চাপাতে দেখা গিয়েছিল, যারা অসহায়ভাবে ওইদিন মৃত্যুবরণ করেছিলেন অথবা কোনো রকমে প্রাণে বেঁচেছিলেন!
 

তাই রানা প্লাজার ঘটনায় কেবল এইবারই নয়, এই রাষ্ট্রক্ষমতায় যতোদিন মালিকশ্রেণির সরকার থাকবে ততোদিন কোনো শ্রমিক হত্যাকাণ্ডেরই সঠিক বিচার হবে না, এমনকি তা যতো বড়ো গণহত্যাই হোক না কেন! এমনকি তা যদি রানা প্লাজার মতো পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো মানবিক বিপর্যয়ও হয়, তারপরও! তারপরও শাসকশ্রেণি একে অন্যকে রুটিন কায়দায় গালিগালাজ দোষারোপ করতেই থাকবে। তাইতো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘হরতাল (ঐদিন বিরেধী দল বিএনপি’র ৩৬ ঘন্টার হরতাল চলছিল) সমর্থক কতিপয় ভাড়াটে লোক সেখানে গিয়ে ফাটল ধরা দালানের বিভিন্ন স্তম্ভ ও গেট ধরে নাড়াচাড়া করেছে। এটাও দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।’

আসলে জন্মলগ্ন থেকেই যে রাষ্ট্রের চরিত্র গণবৈরি এবং এর বেড়ে ওঠার ইতিহাস মুষ্টিমেয় মানুষের (মালিকশ্রেণির) স্বার্থরক্ষাকারী, সেই রাষ্ট্রের কাছ থেকে, তার সরকার ব্যবস্থার কাছ থেকে আমরা কী পেতে পারি? পেতে পারি নিজেদের আরো আত্ম বলিদান, আরো লাঞ্ছনা, আরো অপমান, প্রতারণার আরো নানান ছল। তাই এই রাষ্ট্র-সরকারের কাছে নির্বোধের মতো আমরা কিছুই প্রত্যশা করতে পারি না। প্রয়োজন পরিবর্তন, আমুল পরিবর্তন। সমগ্র রাষ্ট্র ব্যবস্থারই আমূল পরিবর্তন অর্থাৎ বিপ্লব।
তারিখ: ২৭ এপ্রিল ২০১৩ খ্রি.

প্রবন্ধটি রাফখাতা, দ্বন্দ্ব-এ প্রকাশিত হয়েছিল।

0 comments: