আরেকটি নতুন বছরের সূচনা এবং ক্ষমতাসীন বুর্জোয়াদের বাগাড়ম্বর



চলে গেল ২০১২। শুরু হল ২০১৩। বিগত বছরগুলোর মতো এবছরের শুরুতেও বুর্জোয়াদের শান্তনাবাণী, ‘সম্ভাবনার কথা’, ‘সব ভুলে নতুন করে শুরু’ -এরকম কথাবার্তা শুনে শুনে কান ঝালাপালা। বুর্জোয়া প্রচারমাধ্যমের পাতায় পাতায় এইসব সম্মতি উৎপাদনের চেষ্টা!

অথচ একটু ভাবলেই দেখব বিগত ৪১ বছরে বাংলাদেশ রাষ্ট্রে আমরা শান্তিতে ছিলাম না মোটেও। জনজীবনে ছিল না কোন স্বস্তি;। গুম, খুন, হত্যা, ধর্ষণ, এইসব ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। এইসব আতঙ্ক থেকে মুক্ত ছিলাম না আমরা সাধারণ মানুষ। তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ, বাসভাড়া, বাড়িভাড়াসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে বারবার। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার ৪ বছরের মধ্যেই ৭ বার বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, ৫ বার জ্বালানী তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও কয়েকদফা বাসভাড়া, গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি করেছে। আর বিদ্যুতের দাম বাড়লে কেবল তা বিদ্যুতেই আটকে থাকে না, বিদ্যুতের দাম একগুণ বাড়লে অন্য সবকিছুর দাম বাড়ে বহুগুণ। ফলে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাসাভাড়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদিসহ জীবনধারণের ব্যয় বেড়েছে কয়েকগুণ। পণ্য ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্প কারখানাগুলো হুমকির মুখে পড়েছে। কিন্তু শ্রমিকের মজুরি বাড়েনি, জনগণের আয় বাড়েনি; দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রকৃত আয় কমেছে। এইভাবে সরকার জনগণের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে। তারপরও থেমে নেই ক্ষমতাসীনদের বাগাড়ম্বর। প্রতিনিয়ত অতীতের ক্ষমতাসীনদের মতোই চলছে বস্তাপচা কথাবার্তা, বিরোধী দলের প্রতি রুটিন কায়দায় বিষোদ্গার; এবং দেশ দুধ-মধুতে ভেসে যাচ্ছে, জনগণ সুখে-শান্তিতে আছে -এই ধরণের রূপকথার গল্প।



মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার আগে এবং ক্ষমতায় এসেও (আশ্চর্যের বিষয় এখনও) ধর্মনিরপেক্ষতার কথা খুব বেশি করে ব্যবহার করেছে। তারা কতোটা ধর্মনিরপেক্ষ তা জাহির করতে যখন মরিয়া, তখন ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১২ তারিখে রামুর বৌদ্ধপল্লীতে হামলা, আগুন লাগিয়ে সবকিছু ধ্বংশের ঘটনায় স্তম্ভিত দেশ।

এখানেই শেষ নয়। পরদিন ৩০ সেপ্টেম্বর উখিয়া, টেকনাফ ও চট্টগ্রামের পটিয়ায় আরো আটটি বৌদ্ধ বিহারে হামলা চালানো হয়। সেই তাণ্ডবে শুধু বৌদ্ধ পুরাকীর্তিই নয়, রামুর হাজার বছরের সম্প্রীতিও পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর এরকম নৃশংস হামলার ঘটনায় স্তম্ভিত ছিল দেশ। এরকম একটি ঘটনার পরের মাসেই বাংলাদেশের শীর্ষ রপ্তানী আয়ের খাত বলে অভিহিত গার্মেন্টস শিল্পে ঘটে গেল আরেক হৃদয়বিদারক ঘটনা; তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। গত ২৪ নভেম্বর ২০১২ তারিখে তাজরীন ফ্যাশনসের কারখানায় আগুন লেগে কয়েকশ’ শ্রমিক পুড়ে মরলো। এই ঘটনা যে এইবার ২০১২-এ প্রথম তা নয়। মালিকশ্রেণির অধিক মুনাফার নেশার কারণে ১৯৯০ সালের ১৭ ডিসেম্বর সারিকা গার্মেন্টে আগুনে পুড়ে মারা যান ২৭ জন; ১৯৯৫ সালে রাজধানীর ইব্রাহিমপুরের লুসাকা অ্যাপারেলসের কারখানায় নিহত হন ১০ জন; ১৯৯৬ সালে ঢাকার তাহিদুল ফ্যাশনে ১৪ জন এবং সানটেক্স লিমিটেডের কারখানায় আগুনে পুড়ে ১৪ জন মারা যান; ১৯৯৭ সালে ঢাকার মিরপুরের তামান্না গার্মেন্ট এবং মিরপুর মাজার রোডের রহমান অ্যান্ড রহমান অ্যাপারেলস কারখানায় অগ্নিদগ্ধ হন যথাক্রমে ২৭ জন এবং ২২ জন; ২০০০ সালের ২৫ নভেম্বর নরসিংদীর চৌধুরী নিটওয়্যার লিমিটেড গার্মেন্ট-এ আগুনে দগ্ধ হয়ে ৫৩ জন এবং একই বছর বনানীর চেয়ারম্যানবাড়িতে গ্লোব নিটিং ফ্যাশন লিমিটেডে মারা যান ১২ জন; ২০০১ সালের ৮ আগস্ট ঢাকার মিরপুরের মিকো সোয়েটার লিমিটেডে আগুন ধরার গুজবে পদদলিত হয়ে মারা যান ২৪ জন, এর সপ্তাহখানেক আগে মিরপুরের কাফরুলে অগ্নিকান্ডে ২৬ জন; ২০০৪ সালের ডিসেম্বরে নরসিংদীর শিবপুরে গার্মেন্ট কারখানায় আগুন লাগলে দগ্ধ হন ৪৮ জন, একই বছরের ৩ মে মিসকো সুপার মার্কেট কমপ্লেক্সের এক গার্মেন্টসে আগুন লাগলে মারা যান আরো ৯ জন; ২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি নারায়নগঞ্জের রেগাদাইল সান নিটিং কারখানায় ২০ জন; ২০০৬ সালের ২৩ ফেব্র“য়ারি চট্টগ্রামের কে টি এস অ্যাপারেলসে আগুনে দগ্ধ হন ৬৫ জন, ৯ ফেব্র“য়ারি গাজীপুরের যমুনা স্পিনিং মিলে ৬ জন এবং মার্চ মাসে সায়েম ফ্যাশন লিমিটেডে আরো ৩ জন; ২০১০ সালের ফেব্র“য়ারিতে গাজীপুর সদরের গরির অ্যান্ড গরিব সোয়েটার ফ্যাক্টরীতে অগ্নিকাণ্ডে ২১ জন এবং একই বছরে ১৪ ডিসেম্বর আশুলিয়ায় হা-মীম গ্র“পের কারখানায় আগুনে পুড়ে মারা যান ৩০ জন শ্রমিক। এভাবে ২০১০ খ্রি. পর্যন্ত গত দুই দশকে গার্মেন্টস সেক্টরে অব্যবস্থাপনার কারণে মুত্যুবরণ করেন চারশ’র অধিক শ্রমিক। এরই ধারাবাহিকতায় এবার ২৪ নভেম্বর ২০১২ তারিখে কয়েকশ’ শ্রমিক পুড়ে মরলো। শ্রমিককে এভাবে মারতে যেহেতু মালিকশ্রেণি অভ্যস্ত, তাই র‌্যাবের ক্রসফায়ার গল্পের সংবাদ যে রকম সাংবাদিকদের কাছে তৈরি থাকে, তেমনই মালিকশ্রেণির কাছেও বোধ করি এরকম শোকবার্তার ডামিও প্রস্তুত থাকে। ফলে অন্য সকল কিছুতে দেরি হলেও এই একটি কাজে- প্রেসনোট পাঠাতে তাদের মোটেই বিলম্ব হয় না।

তাজরীন ফ্যাশনসে এই ঘটনার দিনই চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটে নির্মাণাধীন ফ্লাইওভারের গার্ডার ভেঙে নিহত হন ১৪ জন শ্রমজীবী। আহত ও পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন শতাধিক। এই ঘটনাও বুর্জোয়াদের নাজুক ব্যবস্থাপনাকেই পরিষ্কার করে ফুটিয়ে তোলে।

এই ঘটনা নিয়ে আলোচনা চলতে চলতেই আর একটি নৃশংস ঘটনায় একইভাবে স্তম্ভিত হয়ে পড়ে দেশবাসী। গত ৯ ডিসেম্বর ২০১২ তারিখে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের অবরোধ চলাকালীন পুরান ঢাকায় সর্বসম্মুখে ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীরা বিশ্বজিৎ নামের এক টেইলার কর্মীকে কুপিয়ে হত্যা করে। বিভিন্ন মিডিয়ার কল্যাণে এই নির্মম ঘটনার ভিডিও ফুটেজ আমরা দেখেছি। ছাত্রলীগের কিছু সন্ত্রাসী একজন মানুষকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে মারছে আর গণমাধ্যমকর্মী, সাধারণ জনগণ, পুলিশ দাঁড়িয়ে দেখছে! অতীতের মতো এবারও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (মহীউদ্দীন খান আলমগীর) ও প্রধানমন্ত্রীর প্রেসসচিব (আবুল কলাম আজাদ) দাবি করেন হত্যাকারীরা কেউ ছাত্রলীগের নন। আবার ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, হত্যাকারীরা ছাত্রলীগ থেকে বহিস্কৃত।

৩১ ডিসেম্বর ২০১২ তারিখে ঐ খুনিদের মধ্যে একজন ইমদাদুল হক আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেন, ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের নির্দেশেই তারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে। বিরোধী দলকে প্রতিরোধ করার কঠোর নির্দেশ ছিল তাদের ওপরে।

এই ঘটনাও এবার প্রথম নয়। গত ৪১ বছরে এরকম অগণিত ঘটনা ঘটিয়েছে ক্ষমতাসীন বুর্জোয়ারা।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের মদদে শেয়ার বাজারে লুটপাট, হলমার্ক জালিয়াতি, এমএলএমসহ ইত্যাদি নানা কায়দায় জনগণের টাকা লুটপাট করা হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদি কোম্পানীর সাথে চুক্তি করে তেল-গ্যাস-কয়লা-খনিজ সম্পদসহ বিভিন্ন জাতীয় সম্পদ লুটপাটের ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করেছে। আর ঐ কোম্পানির পক্ষে জনগণের সম্মতি উৎপাদনের দায়িত্ব নিয়ে জাতীয় বেঈমান- নব্য মীর-জাফর হিসেবে সু-পরিচিত হয়েছে আসাদুজ্জামান নূরসহ অভিনেতা আলী জাকের ও তার পরিবার।

অন্যদিকে সরকার কর্তৃক সভা-সমাবেশের উপর নানারকম নিষেধাজ্ঞা আরোপ, হামলা-মামলাসহ মত প্রকাশের অধিকার হরণ, গুম, হত্যা, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস সর্বোপরি সকল ক্ষেত্রে সন্ত্রাসী একনায়কত্ব কায়েম করেছে। ফলে মহাজোট সরকারের বিরুদ্ধে জনমনে বিক্ষোভ তৈরি হয়েছে। আর এই বিক্ষোভকে ব্যবহার করে এবং মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, চীন, ভারত, সৌদি-আরব প্রভৃতি শক্তির পদলেহন করে গণধিকৃত দুর্নীতিবাজ বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্র করছে।

সেই ১৯৭২ সালে প্রথম বিজয় বার্ষিকী পালনের প্রাক্কালে ১১ ডিসেম্বর চাপাইনবাবগঞ্জের তানোরে নারী-শিশু-বৃদ্ধসহ ১৪ জন ভূমিহীন কৃষককে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করা থেকে শুরু করে আজ অবধি অগণিত গুম, ক্রসফায়ার নামক আষাঢ়ে গল্প ফেঁদে বিনা বিচারে গুলি করে হত্যা, কাঁটাতারে ঝুলন্ত ফেলানী, তাজরীন ফ্যাশনসের কারখানায় শত শত শ্রমিককে পুঁড়িয়ে হত্যা, বিশ্বজিৎকে জনসম্মুখে কুপিয়ে হত্যা, ধর্মীয় দাঙ্গার নামে সাতক্ষীরা, পটিয়া, রামু, উখিয়াতে আগুনে পোড়া গ্রামবাসী, ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বার উপর বর্বর দমন-পীড়ন চট্টগ্রামে ফ্লাইওভারের গার্ডার ভেঙে মানুষ হত্যাসহ এরকম অগণিত ঘটনার মধ্য দিয়ে এই রাষ্ট্রের চরিত্র আজ আমাদের কাছে স্পষ্ট।

জন্মলগ্ন থেকেই যে রাষ্ট্রের চরিত্র গণবৈরি এবং এর বেড়ে ওঠার ইতিহাস মুষ্টিমেয় মানুষের (পুঁজিপতি শ্রেণির) স্বার্থরক্ষাকারী, সেই রাষ্ট্রের কাছ থেকে, তার সরকার ব্যবস্থার কাছ থেকে আমরা কী পেতে পারি? পেতে পারি নিজেদের আরো আত্ম বলিদান, আরো লাঞ্ছনা, আরো অপমান, প্রতারণার আরো নানান ছল। তাই এই রাষ্ট্র- সরকারের কাছে নির্বোধের মতো আমরা কিছুই প্রত্যশা করতে পারি না। প্রয়োজন পরিবর্তন, আমুল পরিবর্তন। সমগ্র রাষ্ট্র ব্যবস্থারই আমূল পরিবর্তন অর্থাৎ বিপ্লব।

তারিখ: ০৪.০১.২০১৩ খ্রি.


তথ্যসূত্র: বিভিন্ন সংগঠনের প্রচারপত্র, সাপ্তাহিক একতা, দৈনিক কালের কন্ঠ, দৈনিক প্রথম আলোসহ আরো কিছু বুর্জোয়া পত্রিকা।


0 comments: